.....



“দ্য ব্লু কার্টেনস” গল্পটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ১৯২০ সালে। এটা স্যার হেনরি রাইডার হ্যাগার্ডের 'স্মিথ অ্যান্ড দ্য ফারাওস, অ্যান্ড আদার টেলস' বইয়ের একটি গল্প। এই সংগ্রহে মোট ছয়টি গল্প আছে। গল্পগুলো হলো: 'স্মিথ অ্যান্ড দ্য ফারাওস', 'মাগেপা দ্য বাক', 'দ্য ব্লু কার্টেন্স', 'দ্য লিটল ফ্লাওয়ার', 'ওনলি আ ড্রিম' এবং 'বারবারা হু কেম ব্যাক'। বইটিতে 'দ্য ব্লু কার্টেনস' হচ্ছে তৃতীয় গল্প।

---------------------------------------------------------


পর্বঃ এক


তার রেজিমেন্টে সবাই তাকে 'বোতল' বলে ডাকত, যদিও কেউ জানতো না ঠিক কি কারনে তাকে এই নামে ডাকা হয়। তবে গুজব ছিল হ্যারো স্কুলে তার নাকের আকৃতির জন্য তাকে এই ডাকনাম দেওয়া হয়েছিল। যদিও তার নাকটা বোতলের মতো ছিল না, শুধু নাকের ডগাটা গোলাকার, বড় আর মোটা ছিল। কিন্তু সত্যি বলতে এই ডাকনাম আরও পুরনো—অর্থাৎ নামটা তার শৈশব থেকেই ছিল। যখন কাউকে ডাকনাম দেওয়া হয় তখন দুটো জিনিস বোঝায়। প্রথমত সে মিশুক আর হাসিখুশি এবং দ্বিতীয়ত সে খুব ভালো মানুষ। আমাদের গল্পের নায়ক বোতলের মধ্যে এ দুটো গুণই রয়েছে। তার আসল নাম জন জর্জ পেরিট। এখানে তার রেজিমেন্টের নাম বলার প্রয়োজন নেই। তার মতো দয়ালু আর ভালো মানুষ খুব কমই দেখা যায়। তবে তার চেহারা? মোটা গোল নাক, ঝোপালো ভ্রুর নিচে বসানো হালকা ধূসর বর্ণের ছোট ছোট চোখ আর বড় একটি মুখ—এগুলোকে সুন্দর বলা যায় না। কিন্তু সে ছিল লম্বা ও শক্তিশালী এবং শান্ত স্বভাবের।


বহু বছর আগে বোতল প্রেমে পড়েছিল; পুরো রেজিমেন্টই তা জানত কারণ তার প্রেম ছিল স্পষ্ট আর গভীর। তার সুন্দর করে গোছানো কোয়ার্টারের বিছানার উপরে এক তরুণীর ছবি ঝুলত; সবাই জানত এটাই সেই মেয়ে। রেজিমেন্টের সদস্যরা যখনই এই ছবিটি দেখত, তাদের মনে কোন সন্দেহ থাকত না যে তাদের সহযোদ্ধার রুচি কতটা চমৎকার। সেই রঙ্গিন ছবিটা ঝাপসা হলেও বোঝা যেত মিস ম্যাডেলিন স্পেন্সারের একটি সুন্দর চেহারা এবং একজোড়া বিস্ময়কর চোখ রয়েছে। তবে শোনা যেত তার কাছে একটি পয়সাও নেই এবং আমাদের নায়কেরও খুব বেশি কিছু ছিল না, তাই ব্যাটালিয়নের বিবাহিত মহিলারা প্রায়ই বলত "মিস্টার পেরিট বিয়ে করলে কীভাবে সংসার চালাবেন?"


এই সময়ে রেজিমেন্টটি নাটালের ম্যারিটজবার্গে ছিল এবং যেহেতু তাদের বিদেশি দায়িত্ব শেষ হয়ে এসেছিল তাই তারা ভেবেছিল হয়ত শিগগিরই দেশে ফিরে যাবে।


এক সকালে বোতল ম্যারিটজবার্গ গ্যারিসনের সেই সময়কার অস্থায়ী সেনা দলের শিকারি কুকুরের দল নিয়ে হরিণ শিকারে গিয়েছিল। শিকারটা বেশ উপভোগ্য ছিল! খোলা মাঠে সাত-আট মাইল দৌড়ে তারা সত্যিই একটা সুন্দর ওরিবে হরিণ শিকার করে ফেলল। এমনটা খুব কমই হত তাই বোতল খুব আনন্দ আর গর্ব নিয়ে হরিণটা স্যাডেলের পেছনে বেঁধে ফিরছিল। শিকার শুরু হয়েছিল ভোরে। শিকারি দলটি সকাল ন’টার সময় ধুলোমাখা চার্চ স্ট্রিটের ছায়াযুক্ত পথে ঘর্মাক্ত আর ক্লান্ত অবস্থায় ঘোড়া দৌড়িয়ে ফিরছিল আর তখনই হঠাৎ গভর্নমেন্ট হাউসের পেছনের কেল্লা থেকে একটি বন্দুকের আওয়াজ ইংরেজ মেইলের আগমন ঘোষণা করল।


এক চিলতে হাসি মুখে নিয়ে বোতল তার ঘরের দিকে এগিয়ে গেল। তার কাছে ইংরেজ মেইল মানেই ম্যাডেলিনের একটা বা দুইটা চিঠি আর সম্ভবত দেশে ফেরার খুশির খবর! সে নিজের কোয়ার্টারে চলে গেল—গোসল করে পোশাক পাল্টাল; তারপর নাস্তার জন্য মেস-হাউসে নামল। সে আশা করছিল হয়ত চিঠিগুলো ইতোমধ্যে এসে গেছে। কিন্তু মেইলটা বেশ ভারী ছিল ফলে সে আরাম করে নাস্তা শেষ করে বারান্দায় বসে একটা পাইপ ধরাল। বাঁশ আর ক্যামেলিয়া গাছের ছায়ায় বারান্দাটা ছিল বেশ আরামদায়ক। অবশেষে অর্ডারলি চিঠির ব্যাগ নিয়ে হাজির হল।


বোতল সাথে সাথেই বারান্দা সংলগ্ন ঘরে ঢুকে শান্তভাবে দাঁড়িয়ে রইল কারণ সে কখনোই নিজের আবেগ প্রকাশ করত না। আর মেস সার্জেন্ট ধীরে ধীরে, বেশ অগোছালোভাবে চিঠিগুলো বাছাই করছিল। অবশেষে বোতল তার প্যাকেট হাতে পেল যার মধ্যে শুধু কিছু খবরের কাগজ আর একটা মাত্র চিঠি। সে কিছুটা হতাশ মনে আবার বারান্দায় চলে এলো। সে আশা করেছিল শুধু তার প্রেমিকা নয় বরং তার একমাত্র ভাইও তার কাছ চিঠি লিখবে। ধীর ও সুচিন্তিত মনের মানুষ বোতল পাইপটি আবার ধরাল—কারণ সে জানে আনন্দকে একটু বিলম্বিত করালে তা বরং আরও বেড়ে যায়। লাল ফুলে ফুলে উজ্জ্বল ক্যামেলিয়া গাছের সামনে বড় চেয়ারে গা এলিয়ে বসে বোতল চিঠিটা খুলে পড়তে আরম্ভ করল:


"আমার প্রিয় জর্জ——"


"হায় আল্লাহ!” মনে মনে চমকে উঠল সে, "এটা কী হলো? ও তো আমায় সবসময় 'ডার্লিং বোতল' বলে ডাকে!"


"আমার প্রিয় জর্জ," সে আবার পড়তে শুরু করল, "আমি জানি না কিভাবে এই চিঠি শুরু করব—আমি কাঁদতে কাঁদতে কাগজটাই দেখতে পাচ্ছি না; আর যখন ভাবি তুমি এই ভয়ানক দেশে বসে এটা পড়ছ, তখন আরও বেশি কান্না পায়। থাক! বরং সোজাসুজিই বলি—সব শেষ, আমাদের মধ্যে সব শেষ, আমার প্রিয়, প্রিয় বুড়ো বোতল।"


"সব শেষ!" বোতল নিজের মনে ফুঁপিয়ে উঠল।


"আমি সত্যিই জানি না কীভাবে এই করুণ গল্পটি বলব" বোতল আবার চিঠিতে ফিরে এলো "কিন্তু বলতেই হবে তাই আমি মনে করি শুরু থেকেই বলা ভাল। এক মাস আগে আমি, বাবা ও খালার সাথে অ্যাথার্টনের হান্ট বল-এ গিয়েছিলাম এবং সেখানে আমার দেখা হয় স্যার আলফ্রেড ক্রস্টনের সঙ্গে—একজন মধ্যবয়স্ক ভদ্রলোক যিনি আমার সঙ্গে কয়েকবার নাচলেন। আমার তাকে তেমন একটা পছন্দ হয়নি। তবে তিনি নিজেকে খুবই আকর্ষণীয় করে উপস্থাপন করেছিলেন। বাড়ি ফিরে খালা (তুমি তো তার বিরক্তিকর অভ্যাস সম্পর্কে জানো) আমাকে বললেন যে আমি তাকে জয় করে নিয়েছি। পরদিন ভদ্রলোক বাড়িতে এলেন। বাবা তাকে ডিনারে আমন্ত্রণ জানালেন এবং তিনি আমার পাশের চেয়ারেই বসলেন। যাওয়ার আগে বললেন হ্রদে ট্রাউট মাছ ধরার জন্য তিনি জর্জ ইনে থাকতে আসছেন। এরপর থেকে প্রায় প্রতিদিনই তিনি এখানে আসতে লাগলেন আর আমি যখনই হাঁটতে বেরুতাম—তিনি সবসময় আমার সাথে দেখা করতেন আর সত্যি বলতে বেশ ভালো ব্যবহার করতেন। অবশেষে একদিন তিনি আমাকে বিয়ের প্রস্তাব দিলেন। আমি খুব রেগে গিয়ে তাকে বললাম যে আমি একজন আর্মি অফিসারের সঙ্গে বাগদান করেছি যিনি এখন দক্ষিণ আফ্রিকায় আছেন। তিনি হেসে বললেন, দক্ষিণ আফ্রিকা এখান থেকে অনেক দূরে। সেদিন সন্ধ্যায় বাবা আর খালা আমাকে বোঝাতে শুরু করলেন।


প্রিয় বোতল, তুমি জানো তারা কেউই আমাদের বাগদান পছন্দ করত না আর তারা বলল—আমাদের সম্পর্কটা একদমই হাস্যকর এবং এমন প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করা মানে আমি পাগল হয়ে গেছি। এভাবে চলতেই থাকলো কারন তিনি নাছোড়বান্দা আর শেষ পর্যন্ত প্রিয়, আমাকে হার মানতেই হলো কারণ ওরা আমাকে একটুও শান্তি দেয়নি। বাবা কেঁদে কেঁদে বললেন এই বিয়ে তার জীবন বদলে দেবে। তাই আমি রাজি হয়েছি আর এখন মনে হয় আমি বাগদান করেছি।


প্রিয়, প্রিয় জর্জ, আমার ওপর রাগ কোরো না। এটা আমার দোষ নয় আর আমি মনে করি আমরা শেষ পর্যন্ত বিয়ে করতে পারতাম না কারণ আমাদের টাকাপয়সার পরিমান অনেক কম। আমি তোমাকে ভালোবাসি কিন্তু কিছুই করতে পারছি না। আমাকে ভুলে যেও না। অন্য কাউকে বিয়ে করো না—অন্তত এখনই নয় কারন এটা ভাবলেই আমার কষ্ট হয়। আমাকে চিঠি লিখে জানিও তুমি আমাকে ভুলবে না এবং তুমি আমার উপর রাগ করোনি। তুমি কি তোমার চিঠিগুলো ফেরত চাও? যদি তুমি আমার চিঠিগুলো পুড়িয়ে ফেলো তাহলেই হবে। বিদায়, প্রিয়! আমি কত কষ্ট পাচ্ছি তুমি যদি তা জানতে! খালার মতো সম্পত্তি ও হীরের কথা বলা সহজ কিন্তু সেগুলো তোমার অভাব পূরণ করতে পারবে না।


বিদায়, প্রিয়। মাথা এতটাই ধরেছে যে আর লিখতে পারছি না।


তোমারই,

“ম্যাডেলিন স্পেন্সার।”


জর্জ পেরিট ওরফে বোতল, চিঠিটা পড়া শেষ করে আবারও একবার পড়ল তারপর অভ্যস্ত নিয়মে সযত্নে ভাঁজ করে পকেটে রাখল। অতঃপর লাল ক্যামেলিয়া ফুলগুলোর দিকে তাকিয়ে রইলো—মনে হচ্ছে সেগুলো হাতের নাগালে নয় বরং অনেক অনেক দূরে। একদম কুয়াশাচ্ছন্ন ও ঘোলাটে।


"এটা অনেক বড় আঘাত" সে মনে মনে বলল। "বেচারি ম্যাডেলিন! ও কত কষ্ট পাচ্ছে!"


কিছুক্ষণ পর সে উঠে দাঁড়াল এবং কিছুটা অস্থিরভাবে কোয়ার্টারের দিকে হেটে গেল। তাকে খুবই বিপর্যস্ত দেখাচ্ছিল। নিজের ঘরে গিয়ে এক টুকরো চিঠির কাগজ নিয়ে দ্রুত লিখতে শুরু করল কারন আউটগোয়িং মেইলটা ধরতে হবে:


"আমার প্রিয় ম্যাডেলিন,


তোমার চিঠি পেয়েছি যেখানে তুমি আমাদের বাগদান ভেঙে দিয়েছ। তুমি নিশ্চয়ই অনেক কষ্ট পাচ্ছ তাই আমি নিজের কথা বলতে চাই না তবু বলতেই হয় এটা আমার জন্য বড় এক আঘাত। আমি এত বছর ধরে তোমাকে ভালোবেসেছি, মনে হয় ছোটবেলা থেকেই; আর এখন তোমাকে হারানো সত্যিই কষ্টের। আমি ভেবেছিলাম দেশে ফিরলে হয়তো কোনো মিলিশিয়া রেজিমেন্টে অ্যাডজুট্যান্টের পদ পাব এবং তখন আমরা বিয়ে করতে পারব। বছরে পাঁচশো পাউন্ডে হয়তো চালিয়ে নিতাম যদিও তোমাকে তোমার অভ্যস্ত আরাম-আয়েশ ছেড়ে দিতে বলার কোনো অধিকার আমার নেই কিন্তু প্রেমে পড়লে মানুষ একটু স্বার্থপর হয়েই যায়। যাই হোক, এখন সব শেষ কারণ তোমার জীবনে বাধা হয়ে দাঁড়ানোর কথা আমি ভাবতেও পারি না।


প্রিয় ম্যাডেলিন, আমি তোমাকে খুব ভালোবাসি আর তুমি এত সুন্দর ও নাজুক যে একজন দরিদ্র সাব-অলটার্নের স্ত্রী হওয়া তোমার জন্য যুতসই নয়। আমি সত্যি বলছি, আমি চাই তুমি সুখী হও। তোমাকে বেশি বেশি আমার কথা ভাবতে বলব না কারণ তাতে হয়তো তোমার কষ্টই বাড়বে। তবে কখনো কখনো একা থাকলে যদি পুরনো এই প্রেমিকের কথা একটু মনে পড়ে, আমি খুশি হব—কারণ আমি নিশ্চিত যে কেউই তোমাকে আমার চেয়ে বেশি ভালোবাসতে পারবে না। কথা দিলাম, আমি তোমায় ভুলব না এবং অন্য কাউকে বিয়েও করব না। মেইল ধরতে হলে এখনই চিঠিটা শেষ করতে হবে; আমার আর কিছু বলার নেই। এটা খুব কঠিন একটি পরীক্ষা—খুবই; কিন্তু দুর্বল হলে চলবে না। আর এই ভেবে আমি সান্ত্বনা পাই যে তুমি নিজের উন্নতি করছ। বিদায়, প্রিয় ম্যাডেলিন। আল্লাহ তোমার মঙ্গল করুন, এটাই আমার চিরদিনের প্রার্থনা।


"জে. জি. পেরিট।"


চিঠিটা শেষ করে তাড়াহুড়োয় পাঠিয়ে দিয়েছে এমন সময় বাইরে জোরে একটা ডাক শোনা গেল, "বোতল, বোতল, বন্ধু আমার, আয়, আনন্দ কর—আদেশ এসে গেছে—আমরা দু'সপ্তাহের মধ্যে রওনা হবো!" এই কথাগুলো বলতে বলতে সেই কণ্ঠের মালিক ঘরে ঢুকল। সেও একজন সাব-অলটার্ন আর বোতলের ঘনিষ্ঠ বন্ধু।


"কিরে, তোকে তো আনন্দিত দেখাচ্ছে না" বলল সে। বোতলের মুখটা মলিন আর হতভম্ব দেখাচ্ছিল।


"না, তেমন কিছু না। তাহলে তুই দুই সপ্তাহ পরে যাচ্ছিস?" বোতল বলল।


" 'তুই যাচ্ছিস?' মানে কী? আমরা সবাই যাচ্ছি! কর্নেল থেকে ড্রামার ছেলে পর্যন্ত!" বন্ধুটা বলল।


"আমি মনে হয় না যাব, জ্যাক" বোতল একটু ইতস্তত উত্তর দিল।


"কী বলছিস, বন্ধু? তুই কি পাগল হয়ে গেছিস? নাকি বেশি গিলে ফেলেছিস?" জ্যাক জিজ্ঞেস করল।


"না, মোটেও না। আমার মাথা ঠিক আছে। অন্য কিছুও খাইনি!" বোতল বলল।


"তাহলে কী বলতে চাস?" জ্যাক জানতে চাইল।


"মানে, সংক্ষেপে বললে, আমি চাকরি ছেড়ে দিচ্ছি। এই জায়গার আবহাওয়া আমার ভালো লাগে। আমি চাষবাস করব।" বোতল বলল।


"চাকরি ছাড়বি? চাষবাস করবি? এই ভয়ানক জায়গায়? তুই নিশ্চয় মাতাল!" জ্যাক বলল।


"না, সত্যিই।" বোতল বলল।


"আর বিয়ের কী হবে? তোর বাগদত্তা মেয়েটির কী হবে? তুই তো তাকে দেখার জন্য এত উৎসুক ছিলিস। সেও কি চাষবাস করবে?" জ্যাক উৎসুক হয়ে জিজ্ঞেস করলো।


বোতলের মুখটা আরও মলিন হয়ে গেল।


"না, দেখ, আমাদের সম্পর্ক শেষ। আমি এখন আর বাগদান করা নই।" বোতল বলল।


"ওহ, তাই" জ্যাক অস্বস্তিতে চলে গেল।


পর্বঃ ২


চাকরি ছাড়ার পর আজ প্রায় বারো বছর হতে চলল; আর এই বারো বছরে বোতলের জীবনে অনেক কিছুই ঘটে গেছে। এর মধ্যে সম্প্রতি এমনও হয়েছে, তার একমাত্র বড় ভাই অপ্রত্যাশিতভাবে ব্যারোনেট উপাধি আর বছরে আট হাজার পাউন্ড পেয়ে গেল এবং বোতল নিজেও পেল কয়েকশো পাউন্ডের একটি মাঝারি কিন্তু তার একার জন্য যথেষ্ট সম্পত্তি। খবরটা যখন তার কাছে পৌঁছায়, তখন সে কেপ কলোনির বাসুটো যুদ্ধের একটিতে স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর ক্যাপ্টেন ছিল। সে যুদ্ধে তার দায়িত্ব শেষ করে বড় ভাইয়ের অনুরোধে এবং নিজ দেশ দেখার তীব্র আকাঙ্ক্ষায় প্রায় চৌদ্দ বছর পর কমিশন ছেড়ে ইংল্যান্ডে ফিরে আসে।


আর এভাবেই এই গল্পের পরের দৃশ্যগুলো দক্ষিণ আফ্রিকার মাঠে বা আধা-শহুরে ঔপনিবেশিক কলোনির কোন সাদা বাড়িতে নয় বরং চিত্রায়িত হবে অ্যালবানির সবচেয়ে আরামদায়ক কোন ঘরে যেখানে বাস করেন বোতলের সেই অবিবাহিত বড় ভাই, স্যার ইউস্টেস পেরিট।


কোন এক নভেম্বরের রাতে উষ্ণ ফায়ারপ্লেসের সামনে একটি আরামদায়ক চেয়ারে বসে আছে বোতল। চেহারাটা আগের তুলনায় আরও বড়, আরও কুৎসিত আর লাজুক হয়েছে—উপরন্তু গালে রয়েছে আসেগাই-এর আঘাতের দাগ। ঠিক বিপরীতে বসে মাঝে মাঝে স্নেহময় কৌতূহলে চশমার ফাঁক দিয়ে তাকিয়ে তাকে দেখছে তার ভাই। স্যার ইউস্টেস পেরিটের বয়স ত্রিশ থেকে পঞ্চাশের মধ্যে হবে, লন্ডন-সুলভ চেহারার একদম আলাদা ধাঁচে গড়া একজন সত্যিকারের ভদ্রলোক। অত্যন্ত উজ্জ্বল চোখ আর চমৎকার দৈহিক গড়ন দেখে মনে হয় তার বয়স ত্রিশের কাছাকাছি।


কিন্তু যখন আপনি তাকে কাছে থেকে চিনতে পারবেন; তার জীবনের অভিজ্ঞতা জানতে পারবেন, বিশ্বজগত সম্পর্কে তার গভীর জ্ঞান মাপতে পারবেন এবং তার কথায় ছড়িয়ে থাকা মজার অথচ গভীর সাইনিক হাস্যরস বুঝতে পারবেন—ঠিক তখনই আপনার মনে হবে তার জন্ম আরও অনেক আগে হয়েছে। বাস্তবে তার বয়স চল্লিশের কম তো হবেই না এবং তিনি জীবনের সুযোগগুলো বিচক্ষণতার সাথে ব্যবহার করে নিজেকে তরুণ আর অভিজ্ঞ রেখেছেন।


"প্রিয় জর্জ" স্যার ইউস্টেস তার ভাইকে সম্বোধন করে বললেন, "অনেক বছর এমন আনন্দ হয়নি"—তিনি ঠিক করেছেন এই দীর্ঘ বিচ্ছেদের পর "বোতল" ডাকনামটা আর ব্যবহার করবেন না।


"কী—কীসের আনন্দ?" বোতল জিজ্ঞেস করল।


"অবশ্যই তোকে আবার দেখার আনন্দ। জাহাজে তোকে দেখেই চিনে ফেলেছিলাম। তুই একটুও বদলাসনি, যদি না ওজন বাড়াকে বদলানো বলে।"


"তুমিও তো বদলাওনি, ইউস্টেস। যদি না ওজন কমাকে বদলানো বলে। তোমার কোমর আগে অনেক প্রসস্থ ছিল, জানো তো।"


"আহ জর্জ, তখন তো আমি বিয়ার খেতাম;" ইউস্টেস বললেন, "এখন বুঝি, সেটা কতটা বোকামি ছিল। আসলে, বয়স বাড়ার সাথে সাথে সকল বোকামিই আমি বুঝতে পেরেছি।"


"শুধু জীবন ছাড়া, তাই না?" বোতল বলল।


"ঠিক বলেছিস—জীবন ছাড়া। আমি আমাদের হতভাগা কাজিনদের মতো হতে চাই না" ইউস্টেস দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন। তারপর হেসে যোগ করলেন, "তবে তাদের দয়ার জন্যই আমরা এখন এত ভালো আছি।" তারপর দুজন চুপ করে গেল।


"চৌদ্দ বছর অনেক দীর্ঘ সময়, জর্জ" ইউস্টেস বললেন, "তোর নিশ্চয় অনেক কষ্ট করতে হয়েছে।"


"হ্যাঁ, বেশ কষ্টই করেছি। জানো তো, আমি অনেক যুদ্ধে লড়েছি" বোতল বলল।


"এবং সম্ভবত কিছুই অর্জন করতে পারিসনি?"


"ওহ, হ্যাঁ; আমি খাবার আর থাকার জায়গা পেয়েছি—এতটুকুই তো আমার যোগ্যতা।"


স্যার ইউস্টেস চশমা দিয়ে তার ভাইয়ের দিকে সন্দিগ্ধ চোখে তাকালেন। "তুই বড্ড বিনয়ী" তিনি বললেন, "এটা ঠিক না। জীবনে উন্নতি করতে চাইলে নিজের সম্পর্কে ভালো ধারণা রাখতে হয়।"


"আমি উন্নতি চাই না। আমি শুধু খেয়ে-পরে বেঁচে থাকতে পারলেই খুশি আর আমি বিনয়ী কারণ অনেক ভালো মানুষকে আমি আরও খারাপ অবস্থায় দেখেছি।"


"কিন্তু এখন তোর রোজগারের দরকার নেই। তুই কী করতে চাস? শহরে থাকবি? আমি তোকে সম্ভ্রান্ত মানুষদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে পারি। তোর গালের ওই দাগ নিয়ে তুই সবার কাছে হিরো হয়ে যাবি। শোন, দাগের গল্পটা আমাকে একদিন বলিস। আর যদি আমার কিছু হয়, তুই উপাধি আর যাবতীয় সম্পত্তি সব পাবি। এটাই তোর জন্য যথেষ্ট হবে।"


বোতল অস্বস্তিতে চেয়ারে নড়েচড়ে বসল। "ধন্যবাদ, ইউস্টেস; কিন্তু সত্যি বলতে আমি এসব চাই না। আমি বরং আবার দক্ষিণ আফ্রিকায় ফিরে স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীতে যোগ দেব। সত্যি বলছি। অচেনা মানুষ আর সমাজ আমি পছন্দ করি না। আমি তোমার মতো এর জন্য উপযুক্ত নই।"


"তাহলে কী করবি? বিয়ে করে গ্রামে গিয়ে থাকবি?" ইউস্টেস জিজ্ঞেস করলেন।


বোতলের রোদে পোড়া তামাটে মুখটা একটু লাল হল—ইউস্টেসের সতর্ক দৃষ্টি সেটা লক্ষ্য করলো। "না, আমি বিয়ে করব না; নিশ্চয়ই না।"


"ওহ, মনে পড়ল" ইউস্টেস অন্যমনস্কভাবে বললেন, "গতকাল তোর পুরোনো প্রেমিকা লেডি ক্রস্টনের সঙ্গে দেখা হয়েছিল। আমি বলেছি, তুই দেশে ফিরছিস। সে এখন খুব সুন্দরী একজন বিধবা।"


"কী!" বোতল বিস্ময়ে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াল। "তার স্বামী মারা গেছে?"


"হ্যাঁ, মারা গেছে। এক বছর হলো, তাতে ভালোই হয়েছে। সে আমাকে তার সম্পত্তি দেখাশোনার দায়িত্ব দিয়েছিল; জানি না কেন, আমরা তো একে অপরকে পছন্দও করতাম না। আমার দেখা সবচেয়ে অপ্রীতিকর লোক ছিল সে। শুনেছি, সে তার স্ত্রীর সাথে মাঝে মাঝে বেশ খারাপ ব্যবহার করত। যদিও ওটা ওর প্রাপ্যই ছিল।"


"কেন, ওর প্রাপ্য কেন?" বোতল জিজ্ঞেস করল।


স্যার ইউস্টেস কাঁধ ঝাঁকালেন। "যখন একটি নির্লজ্জ মেয়ে টাকার জন্য তার বাগদত্তাকে ছেড়ে কোন বুড়োর কাছে নিজেকে বিক্রি করে, তার এটাই প্রাপ্য। ম্যাডেলিন যা পেয়েছে তা তার প্রত্যাশার চেয়েও ভালো।"


বোতল আবার চুপচাপ বসে পড়ল, তারপর সংযত কণ্ঠে বলল "তুমি কি মনে করো না ইউস্টেস, তুমি ওর প্রতি একটু বেশি কঠোর হচ্ছো?"


"কঠোর? না, একটুও না। আমি যত মেয়েকে চিনি, ম্যাডেলিন ক্রস্টন তাদের মধ্যে সবচেয়ে মূল্যহীন। তুই কি ভুলে গেছিস সে তোর সঙ্গে কেমন আচরণ করেছিল?"


"ইউস্টেস" প্রায় তীক্ষ্ণ স্বরে বোতল বলল, "দয়া করে তার সম্পর্কে এমন কথা বোলো না। আমি—আমি এটা পছন্দ করি না।"


স্যার ইউস্টেস বিস্ময়ে চোখ এতটাই বড় করলেন যে তার চশমাটি চোখ থেকে পড়ে গেল। "কী বলছিস, তুই কি বলতে চাস তুই এখনও ওই নারীকে ভালোবাসিস?"


বোতল তার বিশাল দেহটি চেয়ারে অস্বস্তিতে এপাশ-ওপাশ নাড়ল। জানি না, সত্যি ভালোবাসি কি না কিন্তু তোমার মুখে ওর সম্পর্কে এমন কথা শুনতে ভালো লাগছে না।"


স্যার ইউস্টেস হালকা স্বরে শিস বাজালেন। "তোকে কষ্ট দিয়ে থাকলে দুঃখিত, জর্জ" তিনি বললেন। "আমি ভাবিনি এটা তোর কাছে এতটা স্পর্শকাতর। দক্ষিণ আফ্রিকায় তুই নিশ্চয় খুব বিশ্বস্ত মানুষ ছিলি। এখানে মানুষের হৃদয়ের অনুভূতি বারো বছরে অনেকবার বদলায়।"


পর্বঃ ৩


সে রাতে বোতল অনেক দেরি করে ঘুমোতে গেল। এমনকি সর্বদা নিজের স্বাস্থ্যের প্রতি যত্নবান স্যার ইউস্টেস হাই তুলতে তুলতে চলে যাওয়ার অনেক পরেও বোতল বসে রইল এবং পাইপের পর পাইপ টানতে টানতে ভাবতে লাগলো। ঠিক এমনভাবেই সে বহুবার দক্ষিণ আফ্রিকার ভেল্ডে কোনো ওয়াগনের বাক্সের ওপর কিংবা চাঁদের আলো রূপার স্রোতে পরিণত হওয়া সেই জাম্বেসি নদীর জলপ্রপাতে অথবা তার নিজের তাবুতে যখন শিবিরের সবাই ঘুমিয়ে পড়ত—তখনো সে এভাবেই বসে বসে ভাবত। এই অদ্ভুত চুপচাপ মানুষটার অভ্যাস ছিল রাতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে ভাবা, যা মূলত তার অনিদ্রার ফল ছিল। এটাই ছিল তার শরীরের অন্যতম দুর্বলতা।

তার বিচিত্র সেই ধ্যানধারণাগুলোর বেশিরভাগই তার স্বভাবের এক কৌতূহলী কল্পনাপ্রবণ দিক থেকে উৎসারিত যা সে বাইরের জগতে কখনো প্রকাশ করত না। এমন এক সুখস্বপ্ন, যার কোনো ঝলকও তার কঠিন জীবনে কখনো আসেনি; আধা-রহস্যময়, ধর্মীয় ধ্যান আর মানবজাতির পুনর্জন্মের মহৎ পরিকল্পনা—সবই তার ভাবনার অংশ ছিল।

বরং বলা ভালো, তার মনের মধ্যে স্থির নক্ষত্রসদৃশ একটি কেন্দ্রীয় চিন্তার চারপাশে অন্য সকল চিন্তাগুলো গ্রহ-উপগ্রহের মত অবিরাম ঘুরত; আর সেটা ছিল ম্যাডেলিন ক্রস্টনের চিন্তা যার সাথে তার একসময় বাগদান হয়েছিলো। তাকে দেখার পর বহু বছর কেটে গেছে কিন্তু সর্বদাই মনে হত ম্যাডেলিন তার সামনেই আছে। কিছু সামাজিক পত্রিকায় মাঝে মাঝে তার নামের উল্লেখ পাওয়া যেতো যার কারনে বোতল বছরের পর বছর ধরে এসব কাগজ নিয়মিত কিনে ম্যাডেলিনের নাম নিষ্ঠার সাথে খুঁজতে থাকতো। সে তাকে ছেড়ে অন্য একজন পুরুষকে বিয়ে করেছে—কিন্তু তাতে তার ভালোবাসা বিন্দুমাত্র কমেনি। ম্যাডেলিন একবার তাকে ভালোবেসেছিল আর এতেই তার জীবনের সবটুকু ভালোবাসার দাম পরিশোধ হয়ে গেছে। তার কোনো উচ্চাকাঙ্ক্ষা ছিল না বরং ম্যাডেলিনই ছিল তার একমাত্র বড় আকাঙ্ক্ষা; সেটা ভেঙে যাওয়ার সাথে সাথে সবকিছুই ধুলোয় মিশে গেছে। দোষের ভয় বা প্রশংসার আশা ছাড়াই তার পক্ষে যতটুকু সম্ভব সে নিজের কাজ করত; পুরুষদের এড়িয়ে চলত এবং যতটা সম্ভব কোনো নারীর সাথে কথা বলতো না। খেয়ে-পরে বাঁচতে পারলেই খুশি থাকত আর বাকি জীবনটা ছিল তার গোপন ও করুণ ভালোবাসার কারণে বিবর্ণ।

আর এখন জানা গেল ম্যাডেলিন বিধবা—মানে, তার হৃদয় দ্রুত ধুকপুক করতে লাগল—সে এখন মুক্ত নারী। ম্যাডেলিন এখন স্বাধীন আর সে তার থেকে কয়েক মিনিটের হাঁটার দূরত্বে অবস্থান করছে। এখন আর তাদের মাঝে হাজার হাজার মাইল সমুদ্র নেই। সে উঠে টেবিলের দিকে গিয়ে একটি রেড বুক খুলে দেখল। কয়েক সেকেন্ড খুঁজতেই ঠিকানাটা পেয়ে গেল—গ্রোসভেনর স্ট্রিটের একটি বাড়ি। এক অদম্য তাড়নায় সে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল। নিজের ঘরে গিয়ে রেইনকোট আর গোল টুপি পরে চুপচাপ বাড়ি ছাড়ল। তখন রাত দুইটার বেশি, বাইরে প্রবল বৃষ্টি আর ঝড়ো হাওয়া বইছিল।

ছোটবেলায় সে কিছুদিন লন্ডনে ছিল, তাই প্রধান সড়কগুলো তার মনে ছিল। ফলে পিকাডিলি ধরে পার্ক লেনে যেতে তার বিশেষ অসুবিধা হল না; রেডবুকে গ্রোসভেনর স্ট্রিট পার্ক লেনের আশেপাশে দেখাচ্ছিল কিন্তু গ্রোসভেনর স্ট্রিট সহজে খুঁজে পাওয়া গেল না। আর এই গভীর রাতে দুর্যোগপূর্ণ সময়ে কাউকে জিজ্ঞেস করারও উপায় ছিল না—পুলিশ তো দূরের কথা। অবশেষে সে রাস্তাটি খুঁজে পেল আর সাথে সাথেই যেন বুকের ধুকপুকানো আরও বেড়ে গেল। সে দ্রুত এগিয়ে গেল; এতো তাড়াহুড়ো কেন করছে সেটা সে নিজেও জানত না, তবু সেই অদম্য তাড়না তাকে আরও দ্রুত চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল।

সেই মুহূর্তে হঠাৎ সে থমকে দাঁড়িয়ে নিকটতম ল্যাম্পের অস্পষ্ট ও দুর্বল আলোয় একটা বাড়ির নম্বর দেখল। এটাই ছিল সেই বাড়ি; এখন তাদের মাঝে কেবল কয়েক ফুট দূরত্ব আর চৌদ্দ ইঞ্চির একটি ইটের দেয়াল ছাড়া কিছুই নেই। সে রাস্তার অন্য পাশে গিয়ে বাড়িটির দিকে তাকাল কিন্তু ঝড়ো বৃষ্টিতে সবকিছু ঝাপসা দেখাচ্ছিল। বাড়িটি অন্ধকারে ডুবে রয়েছে, কোথাও কোন আলো জ্বলছিল না আর রাস্তায়ও কোনো প্রাণের চিহ্ন দেখা যাচ্ছিল না। কিন্তু এই দাঁড়ানো মানুষের মনে আলো আর প্রাণ দুই-ই ছিল। তার মনের ব্যাকুলতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে শরীরের সমস্ত রক্তস্রোত উত্তাল হয়ে উঠেছিল। তীব্র শীতল হাওয়া আর মুষলধারে বর্ষণ উপেক্ষা করে সে ঝাপসা বাড়িটির দিকে তাকিয়ে রইলো। বোতল অনুভব করল তার জীবন ও আত্মা তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে গিয়ে কোনো অজানা রাজ্যে প্রবেশ করছে। বাইরের ঝড় তার অন্তরের উত্তাল ঝঞ্ঝার তুলনায় কিছুই না বরং সেই অস্থিরতা আর উন্মত্ততার মুহূর্ত ছিল অত্যন্ত সুখকর। কিন্তু যেমন তাড়াতাড়ি ঝড়টা এসেছিল ঠিক তেমনি তাড়াতাড়ি শান্ত হয়ে গেল। বোতল তখনো দাঁড়িয়ে রইলো তার বোকামির এক শীতল অনুভূতি আর দেহে তীব্র শীতের যন্ত্রণা নিয়ে; কারণ এমন রাতে একটি রেইনকোট আর গোল টুপি কোনো প্রেমিকের দেহকে উষ্ণ রাখার জন্য যথেষ্ট ছিল না। সে কাঁপতে কাঁপতে অ্যালবানিতে ফিরে এলো। নিজের এই মাঝরাতের ভ্রমণে নিজেই লজ্জা পেল কিন্তু পরক্ষনেই খুশি হল এই ভেবে যে এই সম্পর্কে কেউ কিচ্ছুটি জানে না।

পরদিন বোতলের বিশেষ ব্যস্ততা ছিল—তার উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত অর্থ সংক্রান্ত বিষয়ে একজন আইনজীবীর সাথে দেখা করতে হল। স্টিমারে হারিয়ে যাওয়া একটি বাক্স খুঁজে বের করতে হল; এছাড়া একটি লম্বা টুপি কিনল। ফলে একাজ ওকাজ করতে করতে বিকাল সাড়ে চারটা নাগাদ অ্যালবানিতে ফিরে এলো। এখানে সে সদ্য ক্রয়কৃত টুপিটি মাথায় দিল যদিও তা খুব একটা ভালো ফিট হচ্ছিল না। নতুন কালো কোটটা এত টাইট হয়ে চেপে বসেছিল যে তার বড় শরীরে ব্যথা করছিল এবং নতুন একজোড়া গ্লাভস পরতে গিয়ে হিমশিম খেতে খেতে সে গ্রোসভেনর স্ট্রিটের উদ্দেশে রওনা দিল।

যেহেতু এবার সে রাস্তাটি চিনত তাই মিনিট পনের হাটার পরেই বাড়িটির কাছে পৌঁছে গেল। গতরাতে সে যেখানে দাঁড়িয়েছিল সেখান থেকে কিছুক্ষন বাড়িটি দেখে অবশেষে সিঁড়ি বেয়ে উঠে বেল বাজাল। বাহ্যিকভাবে তাকে যথেষ্ট সাহসী দেখাচ্ছিল—বরং তার প্রশস্ত কাঁধ এবং তামাটে মুখের ওপর বড়ো কাটা দাগটি তাকে আরও প্রতাপশালী করে তুলেছিল কিন্তু তার হৃদয় ছিল আতঙ্কে পরিপূর্ণ। তবে এই আতঙ্ক বেশিক্ষণ স্থায়ী হলনা কারণ প্রতীকী শোক সাজে সজ্জিত একজন ভৃত্য অত্যন্ত দ্রুততার সাথে দরজা খুলে তাকে অভ্যর্থনা জানাল এবং তাকে উপরে একটি ছোট কিন্তু অত্যন্ত সুসজ্জিত কক্ষে নিয়ে গেল।

কক্ষটিতে ম্যাডেলিন ছিল না তবে একটি নিচু চেয়ারের পাশে মেঝেতে পড়ে থাকা লেসের রুমাল এবং একটি ছোট বেতের টেবিলের ওপর রাখা খোলা উপন্যাস থেকে বোঝা যাচ্ছিল যে সে এই কক্ষ থেকে বেশিক্ষণ আগে যায়নি। "লেডি ক্রস্টনকে তার ব্যাপারে জানানো হবে" গম্ভীর ফিসফিসে কণ্ঠে কথাগুলো বলে ভৃত্যটি চলে গেল। অস্থির অপেক্ষমাণ মানুষের মতো সে ঘরের ছবিগুলো দেখতে দেখতে একজোড়া খুব ভারী নীল মখমলের পর্দার দিকে এগিয়ে গেল—যা স্পষ্টতই অন্য একটি কক্ষের সাথে যুক্ত ছিল এবং সে চোরের মত সেই রুমে উঁকি দিয়ে দেখল যে রুমটি অনেক বড় আর সে রুমে ব্যাগে মোড়া আসবাবপত্রগুলো ভূতুড়ে দেখাচ্ছিল।

এই ভূতুড়ে বিষণ্ণ দৃশ্য থেকে সরে এসে সে ফায়ারপ্লেসের সামনের কার্পেটে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে লাগলো। "ম্যাডেলিন কি তার আসার জন্য রাগ করবে?" সে ভাবল, "এটা কি তাকে পুরোনো কথা মনে করিয়ে দেবে যা সে ভুলতে চায়? কিন্তু হয়তো সে ইতিমধ্যেই সব ভুলে গেছে—এততো বছর কেটে গেছে। সে কি খুব বদলে গেছে? হয়তো সে তাকে চিনতেই পারবে না। হয়তো..." ঠিক এমন সময় সে চোখ তুলে তাকিয়ে দেখল সেই দুটি নীল মখমলের পর্দার মাঝখানে ম্যাডেলিন দাঁড়িয়ে আছে—একজন পূর্ণ দীপ্তিমান রূপের অসাধারণ সৌন্দর্যের অধিকারিণী নারী; অন্তত এই নভেম্বরের নিষ্প্রভ সন্ধ্যায় তার বয়সের কোনো ছাপই পড়েনি। সে তার বড় বড় কালো দুটি চোখে কৌতূহল আর একটু ব্যথাভরা দৃষ্টিতে বোতলের দিকে তাকিয়ে ছিল। এইতো তার সুগঠিত ঠোঁট দুটি কথা বলার জন্য যেন একটু ফাঁক হল আর প্রবল কোন বেদনায় তার বুক ধীরে ধীরে ওঠানামা করছিল।

বেচারা বোতল! এই এক নজরই যথেষ্ট ছিল। তার মন শান্ত হওয়ার কোনো সম্ভাবনাই নেই। পাঁচ সেকেন্ডে সে আরও গভীর প্রেমের সমুদ্রে ডুবে গেল। ম্যাডেলিন বুঝল, বোতল তাকে দেখেছে। সে চোখ নামাল। তার লম্বা বাঁকা চোখের পাপড়িগুলো গালে ঠেকল। সে ধীরপায়ে এগিয়ে এল।

"কেমন আছ?" ম্যাডেলিন নরম স্বরে বলে তার স্নিগ্ধ ঠাণ্ডা হাতটি বাড়িয়ে দিল।

বোতল মন্ত্রমুগ্ধের মত তার হাতটি ধরে ঝাঁকিয়ে দিল কিন্তু প্রাণান্ত চেষ্টা করেও কিছু বলতে পারল না। সে যে কথাগুলো ভেবে রেখেছিল, একটাও মনে এল না। তবু কিছুতো বলতেই হবে। "কেমন আছ?" সে হঠাৎ বলে ফেলল। "খুব—খুব ঠাণ্ডা পরেছে, তাই না?"

কথাটা এত হাস্যকর ছিল যে লেডি ক্রস্টন হেসে ফেলল। "তোমার লাজুকতা এখনো কাটেনি দেখছি" সে বলল।

"অনেক দিন পর আমরা দেখা করছি" বোতল বলে উঠল।

"তোমাকে দেখে আমি খুব খুশি হয়েছি" ম্যাডেলিন সহজভাবে বলল। "বোসো, আমার সঙ্গে কথা বলো। তোমার সম্পর্কে সব কথা বলো। দাড়াও—কি অদ্ভুত ব্যাপার! তুমি জানো, আমি গত রাতে তোমায় স্বপ্ন দেখেছিলাম—একটা অদ্ভুত ও বেদনাদায়ক স্বপ্ন। আমি স্বপ্নে দেখলাম যে আমি আমার ঘরে ঘুমাচ্ছি—যা সত্যিই ছিল; আর বাইরে প্রচণ্ড ঝড় বৃষ্টি হচ্ছে—যা বাস্তবেও ছিল, তাই এতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হচ্ছে আমি স্বপ্নে দেখলাম তুমি বৃষ্টির মধ্যে দাঁড়িয়ে আমাকে দেখছো, যদিও অন্ধকারে থাকার কারনে তোমার মুখ দেখা যাচ্ছিলো না, কিন্তু আমি জানতাম সেটা তুমি। তারপর আমি চমকে উঠে জেগে গেলাম। স্বপ্নটা খুব স্পষ্ট ছিল। আর আজ এত বছর পর তুমি আমাকে দেখতে এসেছ।"

বোতল অস্বস্তিতে পা নাড়ল; এই স্বপ্নের কথা তাকে ভয় পাইয়ে দিয়েছে। কারণ সে তো সত্যিই গতরাতে এসেছিল। সৌভাগ্যবশত, ঠিক সেই মুহূর্তে সেই ভৃত্যটি চায়ের সরঞ্জাম নিয়ে হাজির হলো এবং জিজ্ঞাসা করল আলো জ্বালানো হবে কিনা।

"না," লেডি ক্রস্টন বলল; "আগুনে কাঠ দাও।" সে জানত এই ম্লান আলোয় তাকে সবচেয়ে সুন্দর দেখাচ্ছে।

তারপর সে বোতলকে চিনি ছাড়া চা দিল। বোতল যে চায়ে চিনি পছন্দ করে না এই কথা ম্যাডেলিন মনে রেখেছে—এই ব্যাপারটা তার মন ভরিয়ে দিল। সে তাকে তার বুনো জীবনের গল্প বলতে বলল।

"ওহ মনে পড়ল" ম্যাডেলিন বলল, "কয়েকদিন আগে আমি আমার ছেলের জন্য একটা বই কিনেছিলাম।" (তার দুটি সন্তান ছিল) "সেই বইতে সাহসী কাজকর্ম আর এসব বিষয় নিয়ে গল্প ছিল এবং তাতে দক্ষিণ আফ্রিকার একজন স্বেচ্ছাসেবক অফিসারের গল্প ছিল যা আমাকে খুবই মুগ্ধ করেছিল, যদিও সেখানে তার নাম উল্লেখ করা হয়নি। তুমি কি এই গল্প শুনেছ? গল্পটা এমন:- একজন অফিসার একটি দুর্গের দায়িত্বে ছিলেন যেখানে একটা বাহিনী স্থানীয় নেতার বিরুদ্ধে অভিযান চালাচ্ছিল। কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজে যখন তিনি বাহিরে গেলেন, নেতাটি একটি শান্তিপতাকাসহ দুর্গে দূত পাঠাল কিন্তু দুর্গের কিছু স্বেচ্ছাসেবক তাদের প্রতি বিদ্বেষবশত সেই দূতদের উপর গুলি চালাল। কিছুক্ষণ পর অফিসার ফিরে এসে এই কাজে প্রচণ্ড রেগে গেলেন, বললেন ইংরেজদের কর্তব্য সমগ্র বিশ্বকে সম্মান শেখানো—এমন কাজ তাদের শোভা পায় না।”

"এবার আসলো গল্পের সাহসী অংশ। আর কোনো কথা না বলে এবং তার সৈন্যদের অনুরোধ উপেক্ষা করে তিনি একা বেরিয়ে পড়লেন। তার সৈন্যরা জানত তিনি সম্ভবত একটি নৃশংস মৃত্যুর দিকে যাচ্ছেন কারণ তিনি এতই সাহসী ছিলেন যে স্থানীয়রা তাকে হত্যা করে তার দেহ ওষুধ হিসেবে ব্যবহার করতে চাইত, যাতে তারা তার মতো সাহসী হতে পারে। সেই অফিসার একজন দোভাষী ও একটি সাদা রুমাল নিয়ে পাহাড়ের দিকে রওনা দিলেন এবং শেষ পর্যন্ত নেতার ঘাঁটিতে পৌঁছালেন। স্থানীয়রা যখন তাকে সাদা রুমাল উঁচু করে আসতে দেখল, তারা তার দলের মতো গুলি করল না, কারণ তার সাহস দেখে তারা ভেবেছিল তিনি হয়তো পাগল বা ঐশ্বরিক শক্তিধর। এভাবে তিনি নিরাপদে দুর্গের প্রাচীর পর্যন্ত পৌঁছে নেতার কাছে ক্ষমা চাইলেন এবং নিরাপদে ফিরে এলেন।

কিছুদিন পর, নেতাটি সেই অফিসারের কয়েকজন সৈন্যকে বন্দী করল যাদের সাধারণত সে নির্যাতন করে মেরে ফেলত; কিন্তু এবার তাদের অক্ষত অবস্থায় ফেরত পাঠাল, এই বার্তা দিয়ে যে সে ইংরেজ অফিসারকে দেখিয়ে দেবে যে শুধু তিনিই একমাত্র মানুষ নন যিনি 'ভদ্রলোকের মতো' আচরণ করতে পারেন।”

“আমি সেই মানুষটিকে জানতে চাই। তুমি কি জানো সে কে?"

বোতল অস্বস্তি বোধ করল, কারণ এটা তার নিজের গল্প ছিল কিন্তু ম্যাডেলিনের প্রশংসা ও উচ্ছ্বাসে গর্বে তার মুখ লাল হয়ে উঠল।

"সম্ভবত এটা বাসুটো যুদ্ধের কারো ঘটনা" সে কিছুটা দ্বিধান্বিত হয়ে বলল।

"তাহলে এটা সত্যি গল্প?" ম্যাডেলিন জিজ্ঞেস করল।

"হ্যাঁ, মানে, কিছুটা সত্যি। এতে বীরত্বের কিছু নেই। আমাদের সম্মান বাঁচাতে এটা করা দরকার ছিল।"

"কিন্তু সেই মানুষটি কে?" সে তার কালো চোখ দুটি সন্দেহভরে তার দিকে স্থির করে জিজ্ঞেস করল।

"সেই মানুষ!" বোতল হাঁপিয়ে উঠল, "ওহ, সেই মানুষ—আসলে, সংক্ষেপে—" এবং সে থেমে গেল।

"সংক্ষেপে, জর্জ," ম্যাডেলিন প্রথমবারের মতো তার নাম ধরে ডাকল, "সেই মানুষটি তুমি এবং আমি তোমার জন্য গর্বিত, জর্জ।"

এটি তার জন্য একদিক থেকে খুবই অস্বস্তিকর ছিল কারণ সে এমন প্রশংসা ঘৃণা করত, এমনকি ম্যাডেলিনের কাছ থেকেও। সে এতটাই বিনয়ী ছিল যে সে এই ঘটনাটি কখনই রিপোর্ট করেনি; কিন্তু কোনোভাবে এটি ফাঁস হয়ে গিয়েছিল। তবুও সে খুশি হল যে ম্যাডেলিন তাকে চিনতে পেরেছে। তার এই আবেগপ্রবণতা তার জন্য অনেক বড় কিছু ছিল এবং তার চোখের জ্বলজ্বলে ভাব ও দ্রুত শ্বাসপ্রশ্বাস দেখে বোঝা যাচ্ছিল সে আবেগাপ্লুত হয়েছে।

বোতল মাথা তুলে তাকাতেই তাদের চোখাচোখি হল; ঘরটি এখন প্রায় অন্ধকার হয়ে এসেছিল কিন্তু ভৃত্য যে কাঠ আগুনে দিয়েছিল তার উজ্জ্বল শিখা তার মুখে খেলা করছিল। উভয়ে উভয়ের দৃষ্টিতে আটকে গেল; তার চোখে এমন একটা দৃষ্টি ছিল যা থেকে বোতল পালাতে পারল না। ম্যাডেলিন তার মাথা পিছনে হেলান দিল যাতে তার চকচকে চুলের মুকুটটি নিচু চেয়ারে ঠেকল। সে সোজা বোতলের মুখের দিকে তাকাল। বোতল উঠে ম্যান্টেলপিসের পাশে দাঁড়িয়ে ছিলো। ম্যাডেলিনের নিখুঁত মুখে একটি ধীর ও মিষ্টি হাসি ফুটে উঠল এবং কালো চোখ দুটি কোমল ও উজ্জ্বল হয়ে উঠল, যেন অশ্রুতে ভিজে আছে।

পরের মুহূর্তেই সব শেষ হয়ে গেল, ম্যাডেলিন ভেবেছিল এমনটাই হবে বরং সে চেয়েছিল এটা হোক। সেই বিশাল শক্তিশালী মানুষটি নিচে—হ্যাঁ, তার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল; একটি কাঁপতে থাকা হাত তার চেয়ারের হাতলে জড়িয়ে ধরল এবং অন্যটি তার সুগঠিত কোমল আঙুলগুলোকে চেপে ধরল।

এখন তার মধ্যে কোনো দ্বিধা বা অস্বস্তি ভাব ছিল না। দীর্ঘদিনের জমে থাকা আবেগ তাকে অনুপ্রাণিত করলো এবং সে তাকে সব বলল একটানা—সে তার জন্য যতো কষ্ট সহ্য করেছে সেই সব বছর ধরে, তার সমস্ত হতাশা, কিছুই লুকাল না।

ম্যাডেলিন অনেক কিছু বুঝল না; এমন গভীর আবেগ তার অগভীর মনের সীমার বাইরে ছিল। এমন উচ্চ হৃদয়ের কথা তার সঙ্কীর্ণ কল্পনায় ধরা মুশকিল। তার উঁচু চিন্তাগুলো কখনো কখনো তাকে হাসিয়ে ফেলল। সে ভাবল, এমন পৃথিবীতে কোনো পুরুষের কোনো নারী সম্পর্কে এমন চিন্তা করা হাস্যকর। 

বোতল যখন তার কথা শেষ করল, তখন ম্যাডেলিন কোনো উত্তর দেয়নি কারন সে বুঝতে পেরেছিল যে নীরবতাই তার শক্তি বস্তুত এই প্রেমের সমুদ্রে তার অবস্থান বেশ দুর্বল ছিল। তবে সে শুধু একটি নারীসুলভ কার্যকর যুক্তি ব্যবহার করল; সে তার সুন্দর মুখটি বোতলের দিকে ঝুঁকাল আর বোতল তাকে বারবার চুমু খেল।

পর্বঃ চার


ডিনারের জন্য প্রস্তুত হতে বোতল দ্রুত অ্যালবানির দিকে ফিরে চলল—কারণ সেই রাতে তার ভাইয়ের সাথে একটি ক্লাবে ডিনারে যোগ দেয়ার কথা রয়েছে। তার মনের আনন্দ এবং একইসাথে ঘৃণা এতই প্রবল ছিল যে সে যেন হাঁটতে পারছিল না। এত বছর ধরে প্রেমে নিরন্তর ব্যর্থতার সাথে তার মন এতই অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিলো যে এই সৌভাগ্যকে এখনও সে পুরোপুরি গ্রহণ করতে পারছিল না। হারানো ম্যাডেলিনকে ফিরে পাওয়া এতটাই সুখকর যে তা সত্যি বলে বিশ্বাস করাই কঠিন।

ঘটনাচক্রে, স্যার ইউস্টেস ডিনারে আরও দুই-একজনকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন, যাদের মধ্যে ছিলেন কলোনিয়াল আন্ডার সেক্রেটারি। যিনি দক্ষিণ আফ্রিকার বিষয়ে পার্লামেন্টে একটি কঠোর জেরার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন আর তাই একজন যথেষ্ট অভিজ্ঞ ব্যক্তির থেকে যতটা সম্ভব তথ্য নিতে তিনি মুখিয়ে ছিলেন। কিন্তু এই প্রত্যাশার বিপরীতে বোতলের কাছ থেকে কোনো উপকারী তথ্য বের হলো না। ডিনারের বেশিরভাগ সময় সে নীরব বসে থাকল, শুধুমাত্র সরাসরি জিজ্ঞাসা করা হলে উত্তর দিল আর সেগুলো এতই এলোমেলো ছিল যে আন্ডার সেক্রেটারি দ্রুত উপলব্ধি করলেন স্যার ইউস্টেসের ভাই হয়তো বোকা নয়তো বেশি মদ গিলে ফেলেছে।

স্যার ইউস্টেস নিজেও বুঝতে পারলেন তার ভাইয়ের এই চুপ থাকা তার ছোট্ট ডিনারটি নষ্ট করে দিয়েছে এবং এতে তার মেজাজ খারাপ হলো। ডিনার নষ্ট হওয়ার ব্যাপারে তিনি অভ্যস্ত ছিলেন না, আর তিনি অনুভব করলেন আন্ডার সেক্রেটারির কাছে তিনি একটা বিব্রতকর অবস্থায় পড়েছেন।

"প্রিয় জর্জ," অ্যালবানিতে ফিরে এসে একটু বিরক্ত স্বরে চিবিয়ে চিবিয়ে তিনি বললেন , "আমি ভাবছি তোর কী হয়েছে? আমি আথারলিকে বলেছিলাম যে তুই এই বেচুয়ানা জটিলতা সম্পর্কে তাকে পুরো ব্যাপারটা বলতে পারবি কিন্তু বেচারা তোর কাছ থেকে একটি শব্দও বের করতে পারেনি।"

বোতল অন্যমনস্কভাবে পাইপে তামাক ভরতে ভরতে উত্তর দিল: "বেচুয়ানা? ওহ, হ্যাঁ, আমি তাদের সম্পর্কে সব জানি। তাদের সঙ্গে এক বছর ছিলাম।"

"তাহলে কেন তুই তাকে কিছু বললি না? তুই আমাকে অস্বস্তিতে ফেলে দিয়েছিলি।"

"আমি খুবই দুঃখিত, ইউস্টেস" বোতল নম্রভাবে উত্তর দিল, "তুমি চাইলে আমি কাল তাঁর কাছে গিয়ে সব পরিষ্কার করে বলব। আসল কথা হলো, তখন আমি অন্য কিছু ভাবছিলাম।"

স্যার ইউস্টেস প্রশ্নসূচক দৃষ্টিতে তাকালেন।

"আমি ভাবছিলাম," সে ধীরে ধীরে বলল, "ম্যাড—মানে লেডি ক্রস্টনের কথা।"

"ওহ!"

"আজ বিকেলে তার সাথে দেখা করেছি, আর আমি মনে করি মানে আশা করছি যে আমি তাকে বিয়ে করবো।"

যদিও বোতল আশা করেছিল যে তার বড় ভাই এই সুসংবাদটিকে সাদরে গ্রহণ করবে অর্থাৎ তাকে অভিনন্দন জানাবে কিন্তু দ্রুতই সে হতাশ হল।

"সর্বনাশ!" স্যার ইউস্টেস অকস্মাৎ বলে উঠলেন, তার চশমাটি খসে পড়ল।

কেন এমনটা বলছো, ইউস্টেস?" বোতল কিছুটা অস্বস্তিতে প্রশ্ন করল।

"কারণ, কারণ" তার ভাই জোর দিয়ে বলল "তুই পাগল হয়ে গেছিস, তাই এমন ভাবছিস।"—কথাটি বোতলের কাছে অশ্রাব্য ভাষার সমতুল্য।

কেন পাগল হব?

"কারণ তুই এখনও তরুণ, তোর সারা জীবন পড়ে আছে; অথচ তুই ইচ্ছাকৃতভাবে নিজেকে একজন মধ্যবয়স্কা মহিলার সঙ্গে জড়িয়ে ফেলতে চাস? দিনের আলোয় তাকে বুড়ি মনে হয়, জানিস? সে ইতিমধ্যেই তোর সাথে কুকুরের মতো ব্যবহার করেছে, আবার তার আছে দুই-তিনটা সন্তান। আর সে বিয়ে করলে, শুধু তার বিলাসী অভ্যাস ছাড়া কিছু আনবে না। তবে আমি এটা আশা করছিলাম। আমি জানতাম সে তার সেই মায়াবী কালো চোখ দিয়ে তোকে ফাঁদে ফেলার চেষ্টা করবে। তুই প্রথম না; আমি তাকে ভালোভাবে চিনি।"

"যদি" বোতল রেগে উঠলো, "তুমি ম্যাডেলিনকে আমার সামনে গালি দিতে শুরু করো, তাহলে আমি মনে করি বিছানায় যাওয়াই ভালো হবে কারণ এই বিষয়ে আমি তোমার সাথে ঝগড়া করতে চাই না।

স্যার ইউস্টেস কাঁধ ঝাঁকালেন। আল্লাহ যাদের ধ্বংস করতে চান, প্রথমে তাদের পাগল করেন," হাতে মোমবাতি জ্বালিয়ে তিনি ফিসফিস করে বললেন, "এটা দক্ষিণ আফ্রিকায় দীর্ঘ সময় কাটানোর ফল।"

কিন্তু বাস্তববাদী স্যার ইউস্টেসের প্রিয় মন্ত্র ছিল "বাঁচো এবং বাঁচতে দাও"; এবং পরের দিন সকালে দীর্ঘক্ষণ দাড়ি কাটার সময় বিষয়টি নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করার পর তিনি এই সিদ্ধান্তে পৌঁছালেন যে অনিচ্ছাসত্ত্বেই বোতলকে নিজের ইচ্ছেমত চলতে দেয়া উচিত। যেহেতু সে অনেকটা একরোখা তাই সবচেয়ে ভালো হবে তার ইচ্ছাকে মেনে নেওয়া এবং ভাগ্যের উপর ভরসা রাখা যে হয়তো কিছু না কিছু ঘটবে আর এই পরিকল্পনা ভেস্তে যাবে।

স্যার ইউস্টেস, তার বাহ্যিক দৃষ্টিভঙ্গি আর ব্যঙ্গাত্মক ভাব সত্ত্বেও অন্তরে একজন ভালো মানুষ ছিলেন এবং তার লাজুক ও চুপচাপ ভাইকে খুব ভালোবাসতেন। তবে লেডি ক্রস্টনকে তিনি একেবারেই পছন্দ করতেন না—বিশেষ করে যখন তার চরিত্র তিনি ভালোভাবেই জানতেন। অবশ্য তিনি লেডির সাথে প্রায়ই দেখা করতেন কারণ তিনি তার স্বামীর উইলের এক্সিকিউটর ছিলেন এবং তিনি যখন ব্যারনেট হয়েছিলেন তখন লক্ষ করেছিলেন যে লেডি ক্রস্টন তার সান্নিধ্য পছন্দ করতে শুরু করেছে।

তার ভাই আর তার পুরনো প্রেমিকা ম্যাডেলিনের বিয়ে সব দিক থেকে তার একদম অপ্রিয় ছিল। প্রথমত, তার স্বামীর উইল অনুযায়ী ম্যাডেলিন যদি আবার বিয়ে করে তবে সে তুলনামূলকভাবে খুব কমই সম্পদ নিয়ে আসবে যা একটা সমস্যা। আরেকটা বড় সমস্যা হল এই বয়সে ম্যাডেলিন সম্ভবত পেরিট পরিবারে কোন উত্তরাধিকারীর জন্ম দিতে পারবে না। স্যার ইউস্টেসের নিজে বিয়ে করার কোনো ইচ্ছাও ছিল না। তার মতে বিবাহ সামাজিক মর্যাদার জন্য খুবই জরুরী একটি প্রতিষ্ঠান হলেও সেটার সাথে যুক্ত হওয়ার ব্যাপারে তিনি উৎসাহী নন। তাই যদি তার ভাই বিয়ে করেই, তবে তার আন্তরিক ইচ্ছা ছিল যে ঐ সম্পর্ক থেকে সন্তান হবে যারা পদবী ও এস্টেটের উত্তরাধিকারী হবে। এই দুটি চমৎকার কারণের চেয়েও বেশী ছিল তার সেই নারীর প্রতি গভীর অবিশ্বাস ও ঘৃণা।

যাইহোক, ম্যাডেলিন নামক শয়তান যখন জোর করে, তখনতো মানতেই হয়। তিনি তার একমাত্র ভাই এবং সম্ভাব্য উত্তরাধিকারের সাথে ঝগড়া করতে চাননি শুধুমাত্র এই কারণে যে সে এমন একজন মহিলাকে বিয়ে করতে চায় যাকে তিনি পছন্দ করেন না। তাই তিনি কাঁধ ঝাঁকালেন, তার শেভিং এবং চিন্তা একসাথে শেষ করে ঠিক করলেন এখন থেকে হতাশা লুকিয়ে হাসিমুখে থাকবেন।
"আচ্ছা, জর্জ" সকালের নাস্তায় তিনি তার ভাইকে বললেন, "তাহলে তুই লেডি ক্রস্টনকে বিয়ে করতে যাচ্ছিস?

বোতল অবাক হয়ে তাকাল। "হ্যাঁ, ইউস্টেস," সে উত্তর দিল, "যদি সে আমাকে বিয়ে করে।"

স্যার ইউস্টেস তাকে এক নজর দেখলেন। "আমি ভেবেছিলাম বিষয়টা ইতিমধ্যেই চূড়ান্ত হয়ে গেছে" তিনি বললেন।

বোতল চিন্তিতভাবে তার বড় নাক হাতের মুঠো দিয়ে ঘষতে ঘষতে উত্তর দিল, "না, বিয়ের কথা হয়নি। কিন্তু আমার মনে হয়, সে আমাকে বিয়ে করতে চায়। সংক্ষেপে বলতে গেলে, অন্য কিছু ভাবার প্রশ্নই আসেনা।

স্যার ইউস্টেস স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন, অনুমান করতে পারলেন কী ঘটেছে। তাহলে এখনও পুনরায় কোনো বাগদান হয়নি।

"তুই কবে আবার তার সঙ্গে দেখা করবি?" তিনি জিজ্ঞেস করলেন।

"আগামীকাল। সে আজ সারাদিন ব্যস্ত।"

স্যার ইউস্টেস তার পকেটবুক বের করে চোখ বুলালেন। "তাহলে আমি তোর চেয়ে ভাগ্যবান" তিনি বললেন, আমি আজ রাতে ডিনারের পর লেডি ক্রস্টনের সাথে দেখা করব। ঈর্ষা করিস না, ভাই। এটা শুধুমাত্র উইল এক্সিকিউটর সম্পর্কিত কাজ। তোকে বলেছি তো, আমি তার স্বামীর উইল এক্সিকিউটর। তোর প্রেমিকা একজন স্বতন্ত্র মহিলা এবং শপথ করে বলেছে যে সে তার আইনজীবীদের বিশ্বাস করে না, তাই আমাকে সমস্ত নোংরা কাজ নিজে করতে হয়, কি দুর্ভাগ্য। তুইও আয়।"

"আমি কি অসুবিধার কারণ হব না?" বোতল সন্দেহজনকভাবে জিজ্ঞেস করল, মনে মনে সে প্রলোভন এড়াতে চাইছে।

"তুই বাধা হবি না, ভাই" স্যার ইউস্টেস বললেন। "আমি কাগজপত্রগুলো সই করিয়ে চলে যাব। এমন সুযোগ দেওয়ার জন্য তোর উচিত আমাকে ধন্যবাদ দেওয়া। ঠিক আছে। আমরা একসঙ্গে ডিনার করব এবং তারপর গ্রোসভেনর স্ট্রিটে যাব।

বোতল রাজি হয়ে গেল। যদি সে ঘুণাক্ষররেও তার ভাইয়ের মাথায় ধীরে ধীরে বেড়ে ওঠা ছোট্ট পরিকল্পনাটি জানতে পারতো তাহলে হয়তো এত সহজে রাজি হত না।

গতকাল যখন তার প্রাক্তন প্রেমিক অনিচ্ছাসহকারে ডিনারের জন্য প্রস্তুত হতে গেল, ম্যাডেলিন ক্রস্টন বসে ভাবতে লাগল। যদিও তার ভাবনা পুরোপুরি সন্তোষজনক ছিল না। বোতলকে দেখে খুব ভালো লেগেছিল আর তার দীর্ঘস্থায়ী প্রেমের আবেগজনিত স্বীকারোক্তি তাকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল, এমনকি তার নিজের হৃদয়েও একটা অনুরণন জাগিয়েছিল। 

ভাবতেই গর্ববোধ হচ্ছিল যে এই মানুষটি—যে কিনা তার কদর্যতা ও বিশ্রী ভাব সত্ত্বেও তার প্রবল অনুভূতির উপর ভিত্তি করে তার প্রতি ভালোবাসা কোনোদিন হারায়নি। বেচারা বোতল! একসময় সে তাকে খুব পছন্দ করত। তারা একসাথে বড় হয়েছিল, আর যখন নিজের দায়িত্ব এবং পরিবারকে ভেবে সে তাকে দূরে সরিয়ে দিয়েছিল, তখন সত্যিই তার মন ভেঙেছিল।

আজ সন্ধ্যায় বসে সে মনে করছিলো, সিদ্ধান্তটা কি সত্যিই সঠিক ছিল? যদি সে তার প্রেমিকের পাশে থেকে জীবন সংগ্রামে লড়াই করার সিদ্ধান্ত নিত, তাহলে জীবনের রং কি আরও উজ্জ্বল এবং সুখী হতো না? এখন সে এই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবে। সিদ্ধান্তটা সঠিক ছিল, যদিও সে তার স্বামীকে পছন্দ করত না তবে সামগ্রিকভাবে সে ভালো সময় কাটিয়েছিল, প্রচুর অর্থ উপভোগ করেছিল এবং অর্থের সাথে আসা ক্ষমতা ভোগ করেছিল। তার পরিণত বয়সের জ্ঞান তার যৌবনের সিদ্ধান্তকে সমর্থন করেছিল। বোতলের ব্যাপারে, সে দ্রুতই সেই আবেগ কাটিয়ে উঠেছিল; বছরের পর বছর সে তাকে প্রায় ভুলেই গিয়েছিল যতক্ষণ না স্যার ইউস্টেস তাকে বলেছিলেন যে বোতল ফিরে আসছে এবং তারপর সেই অদ্ভুত স্বপ্নটি দেখেছিল।

এখন সে এসে তাকে প্রেম নিবেদন করছে।
না, এটা সাধারন কোন নিয়মে নয় বরং আগুন যেমন নিজেকে উজার করে দেয় তেমনি বোতল যেন সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ করেছে—এটা এমন এক অদ্ভুত আর মিশ্র অনুভূতি যেখানে সুখ ও ব্যথা একসাথে ছিল; যখন সে একবার স্প্যানিশ বুলফাইটে একজন মানুষকে ষাঁড়ের শিংয়ের গুঁতো খেয়ে উড়তে দেখে শিহরিত হয়েছিল, অনেকটা সেরকম অদ্ভুত এবং কিছুটা ভয়ঙ্কর এক অনুভূতি।

এখন আবার সেই পুরানো প্রশ্ন উঠে এসেছে, কী করা উচিত? দুপুরে সে প্রশ্নটি কোনভাবে এড়িয়েছিলো কিন্তু সে নিশ্চিত যে বোতল তাকে বিয়ে করতে চাইবে। যদি সে রাজি হয়, তাহলে তারা কী দিয়ে জীবনযাপন করবে? তার নিজের আয়? যদি সে আবার বিয়ে করে সেটা চার হাজার থেকে এক হাজার পাউন্ডে নেমে আসবে—এখন চার হাজারে সে হিমশিম খাচ্ছে। আর স্যার ইউস্টেসের কথা মত বোতলের আয় আটশো পাউন্ড। এটা সত্য, সে ব্যারনেট পদবী পাওয়ার পরবর্তী উত্তরাধিকারী কিন্তু স্যার ইউস্টেসকে দেখে ক্ষণজন্মা মনে হয় না আর হয়তো তিনি শেষ পর্যন্ত বিয়েও করতে পারেন।

কয়েক মিনিটের জন্য লেডি ক্রস্টন ভাবল—আঠারোশো পাউন্ডে কীভাবে জীবনযাপন সম্ভব এবং কেঞ্চিংটনের কোনো ছোট্ট বাড়িতে তার সন্তানদের অভিভাবক হিসেবে আদালত তাকে কী দেবে? শিগগিরই সে বুঝল বোতলকে বিয়ে করা সম্ভব নয়।

"স্যার ইউস্টেস যদি তার জন্য কিছু না করেন, তাহলে এটা খুব স্পষ্ট যে আমরা বিয়ে করতে পারব না," সে নিজেকে বলল একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। "তবে এখনই ওকে এটা বলার দরকার নেই, ও তখন শীঘ্রই দক্ষিণ আফ্রিকায় ফিরে যাবে অথবা অন্য কিছু করে বসতে পারে।"

পর্বঃ পাঁচ


স্যার ইউস্টেস ও তার ভাই তাদের পরিকল্পনা মতো কাজ করল। তারা একসঙ্গে ডিনার করে রাত প্রায় সাড়ে নয়টার দিকে গ্রোসভেনর স্ট্রিটে পৌঁছাল। সেখানে গম্ভীর ফিসফিসে কণ্ঠের ভৃত্যটি তাদের ড্রয়িং রুমে নিয়ে গেল আর স্যার ইউস্টেসকে জানাল যে লেডি ক্রস্টন ওপরে নার্সারিতে রয়েছেন আর তিনি বার্তা দিয়েছেন, শিগগিরই নামবেন।

"ঠিক আছে, কোনো তাড়া নেই," স্যার ইউস্টেস অন্যমনস্কভাবে বললেন। দাসী নিচে চলে গেল।

বোতল নার্ভাস ভঙ্গিতে ঘরে এদিক-ওদিক ঘুরঘুর করছিল আর তার ভাই একেবারে স্বাচ্ছন্দ্যে চিন্তামগ্ন হয়ে আগুনের সামনে দাঁড়িয়ে চারিদিক তাকাচ্ছিল। হঠাৎ তার চোখ পড়ল নীল মখমলের পর্দার দিকে যেটা ড্রয়িং রুমকে বড় হলরুম থেকে আলাদা করে রেখেছে—ম্যাডেলিনের বিধবা হওয়ার পর থেকে সম্ভবত সেটা আর ব্যবহার করা হয় না। তার মাথায় ঘুরঘুর করা একটা ভাবনা হঠাৎ স্পষ্ট রূপ নিল।

"জর্জ" তিনি দ্রুত নিচু স্বরে বললেন, "আমার কথা শোন আর এক মুহূর্তের জন্যও বাধা দিস না। তুই জানিস, আমি লেডি ক্রস্টনকে বিয়ে করার ব্যাপারটা একদম পছন্দ করি না। আমি তাকে তুচ্ছ মনে করি, সে মূল্যহীন—না, দাড়া, বাধা দিস না; আমি শুধু আমার মত বলছি। তুই তাকে বিশ্বাস করিস। তুই মনে করিস, সে তোকে ভালোবাসে আর তোকে বিয়ে করবে। এ বিশ্বাসের পেছনে যথেষ্ট কারণও আছে, তাই না?"

বোতল মাথা নাড়ল।

"বেশ। ধর, আমি যদি আধ ঘণ্টার মধ্যে তোকে দেখাতে পারি যে সে অনায়াসেই অন্য কাউকে বিয়ে করতে রাজি—যেমন ধর আমাকেই—তাহলেও কি তুই তাকে বিশ্বাস করবি?"

বোতলের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। "এটা অসম্ভব," সে বলল।

"এটা প্রশ্ন নয়। তখনো কি তুই তাকে বিশ্বাস করবি? তাকে বিয়ে করবি?"

"হায় আল্লাহ! না," বোতল বলল।

"ভালো। তাহলে শোন আমি তোর জন্য কী করব। আর এতে তুই বুঝতে পারবি আমি এ ব্যাপারে কতটা গভীরভাবে ভেবেছি; আমি নিজেকে বলি দেব।"

"নিজেকে বলি দেবে মানে?"

"হ্যাঁ। আমি আজ সন্ধ্যায়, তোর সামনে, ম্যাডেলিনকে বিয়ের প্রস্তাব দেব। আমি পাঁচ পাউন্ড বাজি ধরে বলছি সে রাজি হবে।"

"অসম্ভব," বোতল আবার বলল। "তাছাড়া, সে যদি রাজি হয়, তুমি নিশ্চয়ই তাকে বিয়ে করতে চাইবে না।"

"বিয়ে করব? একেবারেই না। আমি পাগল নই। আমাকে যেকোনো উপায়ে এই ফাঁদ থেকে বেরিয়ে আসতে হবে—অবশ্য যদি মহিলা সম্পর্কে আমার ধারণা সঠিক হয়।"

"আচ্ছা ইউস্টেস," বোতল হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, আমাকে জানতে হবে—সংক্ষেপে, ম্যাডেলিনের সাথে তোমার কি কখনো প্রেমের সম্পর্ক ছিল?"

"কখনোই না,আমার সম্মানের দিব্যি।"

"তবুও গতকাল আমার সাথে যা ঘটেছে তারপরেও তুমি ভাবছো যদি তুমি তাকে প্রস্তাব দাও সে তোমাকে বিয়ে করবে?"

"হ্যাঁ, আমি তাই মনে করি।"

"কেন?'

"কারণ, ভাই," স্যার ইউস্টেস একটা বিদ্রুপাত্মক হাসি দিয়ে বললেন, "বছরে আমার আয় আট হাজার পাউন্ড আর তোর মাত্র আটশো। আমার একটা উপাধি আছে, তোর কিছুই নেই। নিঃসন্দেহে তুই আমার চেয়ে ভালো মানুষ কিন্তু সেটা এই ঘাটতিগুলো পূরণ করতে পারবে না।"

বোতল হাতের ইশারায় তার ভাইয়ের এই ভদ্রতাপূর্ণ প্রশংসা উড়িয়ে দিল, তারপর মুখ শক্ত করে তার দিকে ফিরল।

"আমি তোমার কথা বিশ্বাস করি না, ইউস্টেস," সে বলল। ম্যাডেলিনকে তুমি অপমান করছ অথচ গতকাল আমাকে চুমু খেয়ে বলেছে সে আমাকে ভালোবাসে—আর আজই তোমাকে বিয়ে করতে রাজি হবে?"

স্যার ইউস্টেস কাঁধ ঝাঁকালেন। "আমার মনে হয়, এই মহিলা আগেও এরকম কিছু করেছে, জর্জ।"

"সেটা বহু বছর আগে চাপের মুখে করেছে। এখন ইউস্টেস, তুমি এই অভিযোগ তুলেছ; তুমি ম্যাডেলিনের প্রতি আমার বিশ্বাস ভেঙে দিয়েছ, যাকে আমি বিয়ে করতে চাই। আমি বলছি, প্রমাণ করো—যদি পারো, প্রমাণ করো। আমি আমার জীবন বাজি রেখে বলছি, তুমি পারবে না।"

"উত্তেজিত হোস না, ভাই," স্যার ইউস্টেস বললেন। "আর বাজি ধরার কথা বললে, আমি পাঁচ পাউন্ডের বেশি ঝুঁকি নেব না। এখন দয়া করে ওই মখমলের পর্দার পেছনে গিয়ে দাঁড়া আর চুপচাপ আমার আর লেডি ক্রস্টনের কথাবার্তা শোন। সে জানে না যে তুই এখানে আছিস, তাই তোর উপস্থিতি টের পাবে না। যখন তুই যথেষ্ট শুনে ফেলবি, তখন ইচ্ছে করলে পালাতে পারিস—ওই পর্দার পেছনে সিঁড়ির দিকে একটা দরজা আছে, আমরা যখন উঠছিলাম, আমি লক্ষ্য করেছি সেটা একটু খোলা ছিল। অথবা, ইচ্ছে করলে ক্রুদ্ধ স্বামীর মতো পর্দার আড়াল থেকে মঞ্চে উপবিষ্ট হয়ে পরিস্থিতি অনুযায়ী যে ভূমিকা দরকার সেটা পালন করতে পারিস। আসলেই পরিস্থিতিটা একটু হাস্যকর। আমিও যদি পর্দার পেছনে থাকতাম, খুব মজা পেতাম। যা, ভেতরে যা।

বোতল দ্বিধা করল। "আমি লুকোব না," সে বলল।

"বাজে কথা! ভেবে দেখ, এটার ওপর কত কিছু নির্ভর করছে। প্রেম আর যুদ্ধে সবই জায়েজ। তাড়াতাড়ি কর, ওই যে সে আসছে।"

বোতল ঘাবড়ে গিয়ে ঠিক কি করতে যাচ্ছে তা না বুঝেই শেষ পর্যন্ত রাজি হল। পরক্ষণেই সে অন্ধকার ঘরে পর্দার পেছনে চলে গেল, যেখান থেকে পর্দার ফাঁক দিয়ে সামনের আলোকিত দৃশ্যটা দেখা যাচ্ছিলো। স্যার ইউস্টেস আগুনের সামনে নিজের জায়গায় ফিরে গিয়ে ভাবতে লাগলেন, তার ভাইকে এই আত্মঘাতী বাগদান থেকে বাঁচাতে গিয়ে তিনি নিজেই বেশ ঝামেলায় জড়িয়ে পড়েছেন। যদি ম্যাডেলিন তাকে গ্রহণ করে, তাহলে তার ভাই ক্ষিপ্ত হয়ে উঠবে, সম্ভবত এই মহিলার হাত থেকে বাঁচতে তাকে বিদেশে পালাতে হবে; আর যদি ম্যাডেলিন তাকে প্রত্যাখ্যান করে, তাহলে তিনি বোকা সাজবেন।

এদিকে ম্যাডেলিন সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে আসছিলো আর সাথে তার পোশাকের ঝিরঝির শব্দ ক্রমশ জোরাল হচ্ছিল। পরক্ষণেই সে ঘরে ঢুকল। রূপালি-ধূসর রেশমি পোশাকে তাকে অপূর্ব সুন্দরী দেখাচ্ছিল, কালো লেসের প্রচুর কারুকাজে সাজানো, সামনে-পিছনে চৌকো কাটা যাতে তার গোলাকার কাঁধ দুটো দেখা যায়। সে কোনো গয়না পরেনি—এমন মহিলা খুব কমই আছে যাকে গয়না ছাড়াই এত সুন্দর লাগে। শুধু তার পোশাকের সামনে একটা লাল ক্যামেলিয়া ফুল পিন করা ছিল, সেটাকে নিশ্চয় গয়না বলা যায় না। পর্দার আড়ালে দাঁড়িয়ে লজ্জায় আর সন্দেহে কাঁপতে কাঁপতে বোতল সেই লাল ক্যামেলিয়ার দিকে তাকাল, এটা তাকে কী যেন একটা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে।

হঠাৎ একঝটকায় মনে পড়ে গেল অনেক বছর আগেকার সেই দৃশ্য—দূর নাটালের এক বারান্দায় হাতে একটা খোলা চিঠি নিয়ে সে বসে আছে, আর তার চোখের সামনে ফুলে ভরা একটা ক্যামেলিয়া গাছ। ম্যাডেলিনের বুকের ক্যামেলিয়া ফুলটি তার কাছে অশুভ লক্ষণ বলে মনে হল। পরক্ষণে ম্যাডেলিন কথা বলা শুরু করল।

"ওহ, স্যার ইউস্টেস, আমি আপনার কাছে হাজারবার ক্ষমা চাইছি। আপনি নিশ্চয়ই এখানে দশ মিনিট ধরে অপেক্ষা করছেন, কারণ আপনি আসার সময় আমি সদর দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ শুনেছি। কিন্তু আমার ছোট মেয়ে এফির গলা ব্যথা আর জ্বর এসেছে, উপরন্তু আমার হাত না ধরে সে কিছুতেই ঘুমোতে রাজি হচ্ছিলো না।

"ভাগ্যবতী এফি," স্যার ইউস্টেস অত্যন্ত বিনয়ের সাথে বললেন, আমি তার এই আবদার পুরোপুরি বুঝতে পারি।"

সে মুহূর্তে তিনি নিজেই ম্যাডেলিনের হাত ধরে ছিলেন, আর কথাগুলোর ওপর জোর দেওয়ার জন্য হাত ছাড়ার সময় মৃদু চাপ দিলেন। কিন্তু তার এই অভ্যাসের কথা জানা থাকায় ম্যাডেলিন তেমন গুরুত্ব দিল না। স্যার ইউস্টেস যখন কারো সঙ্গে হাত মেলান, তখন অনেক সময় অপরিচিতরা বুঝতে পারে না তিনি বিয়ের প্রস্তাব দিতে যাচ্ছেন নাকি আবহাওয়া নিয়ে কিছু বলতে যাচ্ছেন। কিন্তু হায়! সবসময়ই শেষ পর্যন্ত আবহাওয়ার কথাই হতো।

"এছাড়াও আমি একজন ব্যবসায়ী হিসেবে এসেছি, আর ব্যবসায়ীরা তো অপেক্ষা করতে অভ্যস্ত" তিনি বলে চললেন।

"আপনি সত্যিই খুব ভালো, স্যার ইউস্টেস, আমার কাজকর্মের জন্য এত কষ্ট করছেন।"

"এটা আমার জন্য আনন্দের, লেডি ক্রস্টন।"

"আহ, স্যার ইউস্টেস, আপনি কি মনে করেন আমি এটা বিশ্বাস করব?" তার পাশে দাঁড়ানো উজ্জ্বল ম্যাডেলিন হেসে বলল। "কিন্তু আমি উকিলদের কতটা ঘৃণা করি আর আপনি কষ্ট করে আমাকে কী থেকে রেহাই দিচ্ছেন সেটা যদি জানতেন, নিশ্চয়ই আপনার সময় দিতে কার্পণ্য করতেন না।"

"এসব কথা বোলো না, লেডি ক্রস্টন। আমি তোমার জন্য এর চেয়ে অনেক বেশি করতে পারি," এখানে তিনি গলা একটু নামিয়ে বললেন, "আসলে, ম্যাডেলিন, তোমার জন্য এমন কিছুই নেই যা আমি করতে পারি না।"

ম্যাডেলিন তার নাজুক ভ্রু দুটো তুলল যেন সেগুলো প্রশ্নবোধক চিহ্নের মতো দেখাল, তার মুখে হালকা লজ্জার রঙ ফুটল। স্যার ইউস্টেসের এই ধরনের কথা তার কাছে একেবারেই নতুন। তিনি কি সত্যি বলছেন? ম্যাডেলিন ভাবল। না, এটা অসম্ভব!

"এখন ব্যবসার কথায় আসি," তিনি এগিয়ে গেলেন, "যদিও খুব বেশি কিছু নয় তবে আমার বোঝা মতো, আপনাকে শুধু এই কাগজে সই করতে হবে, যেটায় আমি ইতিমধ্যে সাক্ষী হিসেবে সই দিয়েছি; তাহলেই শেয়ার হস্তান্তর করা যাবে।”

স্যার ইউস্টেসের একটা বড় খামে করে আনা কাগজে প্রায় না দেখেই ম্যাডেলিন সই করে দিল, তার মন তখনও ইউস্টেসের আগের কথায় আটকে ছিল। সই করে সে কাগজটা আবার খামে ভরে রাখলো।

"এইটুকুই, স্যার ইউস্টেস?" সে জিজ্ঞেস করল।

"হ্যাঁ, এইটুকুই। আমার কর্তব্য যেহেতু শেষ, তাই এখন মনে হয় আমার চলে যাওয়া উচিত।

"আল্লাহর দোহাই, সে চলে যাক!" পর্দার পেছনে বোতল নিজের মনে গজগজ করল। তার ভাইয়ের এই আদুরে আচরণ আর ম্যাডেলিনের সেটা মেনে নেয়া তার মোটেও পছন্দ হচ্ছিল না।

"না, না, আপনি বরং বসুন আর আমার সঙ্গে গল্প করুন—অবশ্য যদি আপনার এর চেয়ে আনন্দদায়ক কিছু করার না থাকে," ম্যাডেলিন বলল।

স্যার ইউস্টেসের তৎক্ষণাৎ প্রশংসাসূচক উত্তর আর ম্যাডেলিনের হাসিমুখে সেটা গ্রহণ করার দৃশ্য আমরা সহজেই অনুমান করতে পারি। সে একটা নিচু চেয়ারে বসল—ঠিক সেই চেয়ারে, যেখানে সে গতকালও বসেছিল।

"এবার তাহলে শুরু করা যাক," স্যার ইউস্টেস মনে মনে বললেন। "জর্জ এখন কী করছে কে জানে?"

"আমার ভাই বলছিল, সে গতকাল তোমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিল," তিনি শুরু করলেন।

"হ্যাঁ," ম্যাডেলিন আবার হেসে জবাব দিল, কিন্তু মনে মনে ভাবল সে তাকে কতটুকু বলেছে।

"সে খুব বদলে গেছে—এরকম কি মনে হয়েছে?"

"না, তেমন কিছু নয়।"

"তোমরা তো একসময় পরস্পরকে খুব ভালোবাসতে, যদি ঠিক মনে থাকে?" তিনি বললেন।

"হ্যাঁ, একসময়।" ম্যাডেলিন উত্তর দিল।

"আমি প্রায়ই ভাবি, এটা কত অদ্ভুত," স্যার ইউস্টেস চিন্তিত স্বরে বলে চললেন, "সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কত রকম পরিবর্তন আসে, বিশেষ করে ভালোবাসার ক্ষেত্রে। সমুদ্র সৈকতে শিশুরা বালির ছোট ছোট ঢিবি তৈরি করে, আর যদি তারা খুব ছোট হয়, তাহলে তারা ভাবে কালও এই ঢিবিগুলো ঠিক এখানেই থাকবে; কিন্তু তারা জোয়ারের কথা ভাবে না। আগামীকাল বালুগুলো একই রকম সমান হয়ে যাবে, আর ছোট শিশুদের আবার নতুন করে শুরু করতে হবে। আমাদের যৌবনের প্রেমের ব্যাপারগুলোও এরকমই, তাই না? সময়ের জোয়ার এসে সবকিছু ভাসিয়ে নিয়ে যায়, আর সেটা আমাদের জন্য ভালোই। যেমন তোমার ক্ষেত্রে, আমার মনে হয় তোমাদের দুজনের জন্যই ভালো হয়েছে যে তোমাদের সেই বালির ঘর টিকে থাকেনি। তাই না?"

ম্যাডেলিন মৃদু দীর্ঘশ্বাস ফেলল। "হ্যাঁ, বোধহয় তাই," সে উত্তর দিল।

পর্দার আড়ালে দাঁড়ানো বোতল দ্রুত অতীতের কথা মনে করল, আর তার মনে হল এর উত্তর একেবারেই ভিন্ন।

"যাক, সেসব তো শেষ হয়ে গেছে," স্যার ইউস্টেস হালকা গলায় বললেন।

ম্যাডেলিন তার কথার প্রতিবাদ করল না; এই মুহূর্তে সেটা করার উপায়ও দেখতে পাচ্ছিল না।

তারপর একটা নীরবতা নেমে এল।

"ম্যাডেলিন," স্যার ইউস্টেস কিছুক্ষণ পরে গলার স্বর বদলে বললেন, "তোমার সাথে কিছু কথা আছে।"

"সত্যিই, স্যার ইউস্টেস," সে আবার প্রশ্নবোধক ভাবে ভ্রু তুলে জবাব দিল, "কী কথা?"

"ব্যাপারটা হল, ম্যাডেলিন—আমি চাই তুমি আমার স্ত্রী হও।"

নীল মখমলের পর্দা হঠাৎ একটা ঝাঁকুনি দিল, যেন কোনো আধ্যাত্মিক সভায় অংশ নিচ্ছে।

স্যার ইউস্টেস সতর্ক চোখে পর্দার দিকে তাকালেন। ম্যাডেলিন কিছু দেখল না।

"সত্যিই, স্যার ইউস্টেস!"

"আমি জানি এটা তোমাকে অবাক করছে," এই উত্সাহী প্রেমিক বলে চললেন, “"আমার প্রস্তাব হয়তো হঠাৎ মনে হচ্ছে, কিন্তু আসলে তা নয়।"

"হায় আল্লাহ, কী মিথ্যে কথা!” পর্দার আড়ালে বিপর্যস্ত বোতল নিজের মনে গোঙাল।

"আমার মনে হয়েছিল, স্যার ইউস্টেস," ম্যাডেলিন তার মিষ্টি নীচু গলায় বলল, "আপনি তো কিছুদিন আগেই বলেছিলেন যে আপনি কখনো বিয়ে করবেন না।"

"ঠিকই ম্যাডেলিন, কারণ আমি ভেবেছিলাম  তোমাকে বিয়ে করার কোনো সম্ভাবনা নেই" (তিনি মনে মনে বললেন, "যদিও এখনো আমি সেটাই মনে করি।") "কিন্তু—কিন্তু, ম্যাডেলিন, আমি তোমাকে ভালোবাসি।" (তিনি ভাবলেন, "আল্লাহ আমাকে এই মিথ্যের জন্য ক্ষমা করুন!") "ম্যাডেলিন, জবাব দেওয়ার আগে আমার কথা শোনো," তিনি তার চেয়ারটা ম্যাডেলিনের কাছাকাছি টেনে এনে বললেন। "আমি আমার একাকিত্ব অনুভব করি, আর আমি বিয়ে করতে চাই। মনে হয় আমরা একসাথে ভালো থাকব। আমাদের এই বয়সে আমরা কেউই হয়তো আমাদের চেয়ে অনেক কম বয়সী কাউকে বিয়ে করতে চাইব না। ম্যাডেলিন, তোমার চরিত্রের সৌন্দর্য দেখার অনেক সুযোগ পেয়েছি আর তোমার রূপের সৌন্দর্য কোনো পুরুষের চোখ এড়াতে পারে না। আমি তোমাকে দিতে পারি ভালো অবস্থান, ভালো সম্পত্তি, আর আমি নিজে, যেমনই হই না কেন। তুমি কি আমাকে গ্রহণ করবে?" তিনি ম্যাডেলিনের হাতে হাত রেখে তার চোখের দিকে একদৃষ্টে তাকালেন।

"সত্যিই, স্যার ইউস্টেস," ম্যাডেলিন মৃদু স্বরে বলল, "এটা খুবই অপ্রত্যাশিত আর হঠাৎ।"

"হ্যাঁ, ম্যাডেলিন, আমি জানি। এভাবে ঝড়ের মতো আসার কোনো অধিকার আমার নেই, কিন্তু আশা করি আমার এই তাড়াহুড়োটা আমার বিপক্ষে যাবে না। একটু ভেবে দেখার সময় নাও—ধরো এক সপ্তাহ" ("ততদিনে," তিনি মনে মনে ভাবলেন, "আমি আলজিয়ার্সে থাকব।") "শুধু, যদি পারো, ম্যাডেলিন, আমাকে বলো যে আমি আশা রাখতে পারি।"

ম্যাডেলিন তৎক্ষণাৎ কোনো উত্তর দিল না বরং হাত দুটো কোলে ফেলে রেখে সোজা সামনে তাকিয়ে রইল। তার সুন্দর চোখ দুটো শূন্যে স্থির, আর মন পুরোপুরি ব্যস্ত হয়ে পড়ল পরিস্থিতির ভালো-মন্দ বিবেচনায়। তখন স্যার ইউস্টেস সাহস পেলেন; নিচু হয়ে তিনি ম্যাডেলিনকে চুমু খেলেন। তবু কোনো প্রতিক্রিয়া এল না। শুধু খুব আলতো করে সে তাকে ঠেলে দিয়ে ফিসফিস করে বলল:

"হ্যাঁ, ইউস্টেস, মনে হয় তোমাকে বলতে পারব যে তুমি আশা রাখতে পারো।"

বোতল আর দেখতে পারল না। দাঁতে দাঁত চেপে, দু চোখে আগুন আর ভাঙা মন নিয়ে সিঁড়ির দরজা দিয়ে নিঃশব্দে বেরিয়ে হলঘরে পৌঁছল। দেয়ালের পেরেকে ঝুলছিল তার হ্যাট আর কোট; সেগুলো নিয়ে রাস্তায় বেরিয়ে পড়ল।

"আমি একটা লজ্জাজনক কাজ করেছি," সে মনে মনে ভাবল, "আর তার মাশুলও দিয়েছি।"

দরজা বন্ধ হওয়ার হালকা শব্দও স্যার ইউস্টেস শুনতে পেলেন; তারপর তিনিও ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। মৃদু গলায় বললেন, "আমি শীঘ্রই আমার উত্তরের জন্য ফিরে আসব, ম্যাডেলিন।"

রাস্তায় পৌঁছানোর পর দেখলেন তার ভাই চলে গেছে।



চলবে.................

ই-মেইল সাবস্ক্রিপশন

Enter your email address:

Delivered by FeedBurner

ক্যাটাগরীসমূহ

পৃষ্ঠাসমূহ

Creative Commons License
This work is licensed under a Creative Commons Attribution 3.0 Unported License.
Protected by Copyscape

ব্লগটি মোট পড়া হয়েছে

বাঙলা ব্লগ. Powered by Blogger.

- Copyright © মেহেদী হাসান-এর বাঙলা ব্লগ | আমার স্বাধীনতা -Metrominimalist- Powered by Blogger - Designed by Mahedi Hasan -