Showing posts with label রূপান্তর. Show all posts
ল্যাফক্যাডিও হার্ন এর দ্য সোল অব দ্য গ্রেট বেল (The Soul of the Great Bell) রূপান্তর মেহেদী হাসান
প্যাট্রিক ল্যাফক্যাডিও হার্ন ছিলেন গ্রিসে জন্মগ্রহণকারী একজন লেখক যিনি পশ্চিমা পাঠকদের কাছে পূর্ব এশীয় সংস্কৃতিকে তুলে ধরেছিলেন। গ্রিক মা ও আইরিশ বাবার সন্তান হার্ন আমেরিকায় সাংবাদিকতা দিয়ে তাঁর কর্মজীবন শুরু করেন। ১৮৯০ সালে তিনি জাপানে পাড়ি জমান এবং সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। জাপানে তিনি বিভিন্ন শহরে ইংরেজি ভাষা পড়াতেন, অতঃপর একটি সামুরাই পরিবারের সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্কে আবদ্ধ হন এবং দেশটির সমাজ ও সংস্কৃতির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে পড়েন। ১৮৯৬ সালে তিনি জাপানের নাগরিকত্ব গ্রহণ করে "কোইজুমি ইয়াকুমো" নাম গ্রহণ করেন। তাঁর বিখ্যাত ছোটগল্প "দ্য সোল অব দ্য গ্রেট বেল" ১৮৮৭ সালে তাঁর 'সাম চাইনিজ ঘোস্টস' গল্পসংকলনের অংশ হিসেবে প্রকাশিত হয়েছিল।
---------------------------------------------------------
দ্য সোল অব দ্য গ্রেট বেল
- ল্যাফক্যাডিও হার্ন
‘তা-চুং জ’ বা মহাঘণ্টার মিনারে রাখা জলঘড়িটি সময়ের সংকেত দিচ্ছে; আর ঠিক তখনই সেই ধাতব দানবের ঠোঁটে আঘাত করার জন্য হাতুড়িটি উত্তোলিত হলো—যে বিশাল ঘণ্টাটির গায়ে পবিত্র ফা-হোয়া-কিং এবং লিং-ইয়েন-কিং-এর বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থের শ্লোক খোদাই করা আছে! শুনুন, মহাঘণ্টাটি কেমন প্রতিধ্বনি তুলছে! তার কোনো জিহ্বা নেই, তবুও কী তার জোরালো কণ্ঠস্বর! "কো-নগাই!"
সবুজ ছাদের উঁচু কার্নিশে থাকা ছোট ছোট ড্রাগনগুলোর সোনালী লেজের ডগা পর্যন্ত সেই গভীর শব্দের ঢেউয়ে কাঁপছে; চীনামাটির তৈরি সব গার্গয়েল বা ভাস্কর্য তাদের কারুকাজ করা বেদিতে থরথর করে কাঁপছে; প্যাগোডার শত শত ছোট ঘণ্টাও যেন কথা বলার তীব্র আকাঙ্ক্ষায় অস্থির হয়ে উঠছে। "কো-নগাই!"
মন্দিরের সব সবুজ ও সোনালি টাইলস কাঁপছে; তাদের ওপরের কাঠের সোনালি মাছগুলো যেন আকাশের গায়ে ছটফট করছে; ধূপের নীল ধোঁয়ার ভেতর ভক্তদের মাথার ওপর বুদ্ধের উত্তোলিত আঙুলও কাঁপছে! "কো-নগাই!"
কী বজ্রকঠিন সেই সুর! প্রাসাদের কার্নিশে রাখা সব বার্নিশ করা অপদেবতাগুলো তাদের আগুন রঙের জিভ নাড়াতে শুরু করেছে! আর প্রতিটি বিশাল আঘাতের পর, সেই প্রতিধ্বনির কী অদ্ভুত শব্দ—যেন এক বিশাল সোনালি গোঙানি; এবং সবশেষে কানে ভেসে আসে এক আকস্মিক ফিসফিসানি কান্না, যখন সেই বিশাল গর্জন ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে রুপালি ফিসফিসানিতে মিলিয়ে যায়—যেন কোনো নারী কেঁদে বলছে, "হিয়াইইই…!"
গত প্রায় পাঁচশো বছর ধরে মহাঘণ্টাটি প্রতিদিন ঠিক এভাবেই বেজে চলেছে—"কো-নগাই": প্রথমে সেই প্রচণ্ড ঝনঝনানি, তারপর অপরিমেয় সোনালি গোঙানি, আর সবশেষে সেই রুপালি ফিসফিসানি—"হিয়াইইই…!" আর এই পুরনো রঙিন চীনা শহরের অলিগলিতে এমন কোনো শিশু নেই যে এই মহাঘণ্টার গল্প জানে না যে আপনাকে বলতে পারবে না কেন এই ঘণ্টাটিকে "কো-নগাই" বলে ডাকে!
এই সেই মহাঘণ্টার ইতিকথা যা 'তা-চুং জ'-এ সংরক্ষিত আছে এবং যা কুয়াং-চাউ-ফু শহরের পণ্ডিত ইউ-পাও-চেন তার 'পে-হিয়াও-তু-চোন' গ্রন্থে লিপিবদ্ধ করে গেছেন।
প্রায় পাঁচশো বছর আগের কথা। মিং রাজবংশের স্বর্গীয় মহানুভব স্বর্গপুত্র ইয়াং-লো তার বিশ্বস্ত আমলা কুয়ান-ইউকে আদেশ দিলেন এমন বিশাল আকারের একটি ঘণ্টা তৈরি করতে, যার আওয়াজ একশো 'লি' (চীনা মাইলের একক) দূর পর্যন্ত শোনা যাবে। তিনি আরও নির্দেশ দিলেন যে, ঘণ্টার আওয়াজকে পিতল দিয়ে শক্তিশালী, সোনা দিয়ে গভীর এবং রুপা দিয়ে মিষ্টি করতে হবে; আর এর গায়ে এবং বিশাল ঠোঁটে পবিত্র গ্রন্থের আশীর্বাদপুষ্ট বাণী খোদাই করতে হবে। ঘণ্টাটি ঝোলানো হবে সাম্রাজ্যের রাজধানীর ঠিক মাঝখানে, যেন পিকিং শহরের রঙিন পথঘাট এর সুরে মুখরিত হয়।
অতএব, মান্যবর ম্যান্ডারিন কুয়ান-ইউ সাম্রাজ্যের সেরা ছাঁচ-নির্মাতা এবং বিখ্যাত সব কামার ও ঢালাই-শিল্পীদের ডেকে পাঠালেন। তারা সংকর ধাতুর পরিমাপ করল, নিপুণভাবে সেগুলো প্রক্রিয়াজাত করল এবং ছাঁচ, চুল্লি ও ধাতু গলানোর জন্য দানবীয় সব হাঁড়ি তৈরি করল। তারা দৈত্যের মতো পরিশ্রম করতে লাগল—নিদ্রা, বিশ্রাম বা জীবনের আরাম-আয়েশ সব তুচ্ছ করে দিনরাত তারা কুয়ান-ইউর আদেশে খাটতে লাগল, আর তাদের একমাত্র লক্ষ্য ছিল স্বর্গপুত্রের আদেশ পালন করা।
কিন্তু যখন ধাতু গলিয়ে ছাঁচ থেকে বের করা হলো, দেখা গেল তাদের এত কঠোর পরিশ্রম আর যত্ন সত্ত্বেও ফলাফল শূন্য। কারণ ধাতুগুলো একে অপরের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছে—সোনা পিতলের সঙ্গে মিশতে ঘৃণাভরে অস্বীকৃতি জানিয়েছে, আর রুপা গলানো লোহার সঙ্গে কিছুতেই মিশবে না। তাই আবার নতুন করে ছাঁচ তৈরি করতে হলো, আগুন জ্বালাতে হলো, ধাতু গলাতে হলো এবং পুরো ক্লান্তিকর প্রক্রিয়াটি আবারও পুনরাবৃত্তি করতে হলো। স্বর্গপুত্র সব শুনে ক্রুদ্ধ হলেন, কিন্তু মুখে কিছু বললেন না।
দ্বিতীয়বার ঘণ্টাটি ঢালাই করা হলো, কিন্তু ফলাফল হলো আরও ভয়াবহ। ধাতুগুলো আবারও এক হতে জেদ ধরে বেঁকে বসল; ঘণ্টাটির কোথাও সামঞ্জস্য রইল না। এর গায়ে বড় বড় ফাটল দেখা দিল এবং ঠোঁটগুলো ভেঙেচুরে গেল। ফলে কুয়ান-ইউকে অত্যন্ত হতাশ হয়ে তৃতীয়বারের মতো পুরো কাজটা শুরু করতে হলো। যখন স্বর্গপুত্র এই খবর পেলেন, তিনি আগের চেয়েও ভীষণ রেগে গেলেন। আর তিনি লেবু-রঙের রেশমি কাপড়ের ওপর লেখা, ড্রাগনের সিলমোহর মারা একটা চিঠি কুয়ান-ইউ-র কাছে পাঠালেন, তাতে লেখা ছিল:
"পরাক্রমশালী ইয়াং-লো, মহান তাই-সুং, স্বর্গীয় এবং মহিমান্বিত—যাঁর রাজত্ব 'মিং' নামে পরিচিত—তার পক্ষ থেকে ফুহ-ইইন কুয়ান-ইউকে: দুবার তুমি আমাদের বিশ্বাস ভঙ্গ করেছ, যা আমরা দয়া পরবশ হয়ে তোমার ওপর অর্পণ করেছিলাম। যদি তৃতীয়বার তুমি আমাদের আদেশ পালনে ব্যর্থ হও, তবে তোমার ধড় থেকে মস্তক বিচ্ছিন্ন করা হবে। ভয় পাও এবং মান্য করো!"
কুয়ান-ইউর একটি মেয়ে ছিল, নাম কো-নগাই। সে ছিল চোখধাঁধানো রূপসী, কবিদের মুখে মুখে ফিরত তার নাম; আর তার মন ছিল তার রূপের চেয়েও সুন্দর। কো-নগাই তার বাবাকে এতই ভালোবাসত যে, সে শত শত যোগ্য পাত্রের প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছিল শুধু এই ভয়ে যে, তার অনুপস্থিতিতে বাবার ঘর শূন্য হয়ে যাবে। যখন সে ড্রাগন-সিলযুক্ত সেই ভয়ানক হলুদ চিঠিটি দেখল, বাবার আসন্ন বিপদের কথা ভেবে সে ভয়ে জ্ঞান হারাল। জ্ঞান ও শক্তি ফিরে পাওয়ার পর, বাবার বিপদের চিন্তায় তার চোখে ঘুম নেই। সে গোপনে নিজের কিছু গয়না বিক্রি করল এবং সেই টাকায় এক জ্যোতিষীর কাছে ছুটে গেল। জ্যোতিষীকে অনেক অর্থ দিয়ে সে জানতে চাইল, কীভাবে তার বাবাকে এই আসন্ন বিপদ থেকে রক্ষা করা যায়।
জ্যোতিষী আকাশের নক্ষত্র পর্যবেক্ষণ করলেন, মিল্কি ওয়ের (যাকে আমরা আকাশগঙ্গা বলি) গতিবিধি দেখলেন, রাশিচক্রের চিহ্ন বা 'হলুদ পথ' পরীক্ষা করলেন এবং মহাবিশ্বের পাঁচটি মূলনীতি বা 'হিন'-এর তালিকা ও রসায়নবিদদের রহস্যময় বইগুলো ঘাঁটলেন। দীর্ঘ নীরবতার পর তিনি উত্তর দিলেন: "সোনা এবং পিতল কখনোই বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হবে না, রুপা এবং লোহা কখনোই একে অপরকে আলিঙ্গন করবে না, যতক্ষণ না কোনো কুমারীর রক্ত-মাংস সেই গলিত ধাতুর পাত্রে আহুতি দেওয়া হয়; যতক্ষণ না কোনো কুমারীর রক্ত সেই সংকর ধাতুর সঙ্গে মিশে যায়।"
কো-নগাই বিষণ্ণ হৃদয়ে বাড়ি ফিরল; কিন্তু সে যা শুনেছে তা গোপন রাখল এবং কাউকেই বলল না সে কী করতে যাচ্ছে।
অবশেষে সেই ভয়ানক দিনটি এল, যেদিন তৃতীয় এবং শেষবারের মতো মহাঘণ্টাটি ঢালাই করার চেষ্টা করা হবে। কো-নগাই তার এক পরিচারিকাকে নিয়ে বাবার সঙ্গে ঢালাইশালায় গেল। তারা এমন একটি উঁচু মঞ্চে দাঁড়াল যেখান থেকে নিচে কর্মরত শ্রমিকদের এবং গলিত ধাতুর লাভাস্রোত দেখা যাচ্ছিল। শ্রমিকরা নিঃশব্দে তাদের কাজ করে যাচ্ছিল; আগুনের গর্জন ছাড়া আর কোনো শব্দ শোনা যাচ্ছিল না। সেই আগুনের গর্জন ক্রমশ গভীর হয়ে ধেয়ে আসা টাইফুনের মতো শোনাতে লাগল। রক্তিম ধাতুর হ্রদটি ধীরে ধীরে ভোরের সূর্যের মতো উজ্জ্বল হয়ে উঠল, সেই সিঁদুরবরণ আভা বদলে গিয়ে সোনালি দ্যুতি ছড়াতে লাগল, আর সবশেষে সেই সোনা চোখের ধাঁধাঁ লাগানো পূর্ণিমার চাঁদের মতো রুপালি ও সাদা হয়ে উঠল। তখন শ্রমিকরা সেই উন্মত্ত আগুনে জ্বালানি দেওয়া বন্ধ করল এবং সবাই কুয়ান-ইউর চোখের দিকে তাকিয়ে রইল সংকেতের অপেক্ষায়। কুয়ান-ইউ ঢালাই শুরু করার সংকেত দিতে প্রস্তুত হলেন।
কিন্তু তিনি আঙুল তোলার আগেই, একটি চিৎকার শুনে মাথা ঘুরালেন। আগুনের সেই প্রচণ্ড গর্জন ছাপিয়ে পাখির গানের মতো তীব্র অথচ মিষ্টি একটি কণ্ঠস্বর সবার কানে বাজল—"শুধু তোমার জন্য, ও বাবা আমার!"—এবং কথাটি বলতে বলতেই কো-নগাই সেই ধবধবে সাদা ধাতব স্রোতে ঝাঁপিয়ে পড়ল। চুল্লির লাভাস্রোত তাকে গ্রাস করতে গর্জন করে উঠল, আর ছাদ পর্যন্ত দৈত্যাকার আগুনের ফুলকি ছিটিয়ে দিল এবং মাটির পাত্র উপচে নানা রঙের আগুনের ফোয়ারা সৃষ্টি করে ভূমিকম্পের মতো কাঁপতে কাঁপতে বিদ্যুৎ, বজ্রপাত আর গোঙানিসহ শান্ত হয়ে গেল।
কো-নগাইয়ের বাবা শোকে পাগল হয়ে মেয়ের পিছু পিছু ঝাঁপ দিতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু শক্তিশালী শ্রমিকরা তাকে জাপটে ধরল এবং দৃঢ়ভাবে ধরে রাখল যতক্ষণ পর্যন্ত না তিনি জ্ঞান হারালেন; শেষে তাকে মৃতপ্রায় অবস্থায় বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া হলো। আর কো-নগাইয়ের সেই পরিচারিকা যন্ত্রণায় হতভম্ব আর বাকরুদ্ধ হয়ে চুল্লির সামনে দাঁড়িয়ে রইল। তার হাতে ধরা ছিল শুধু একটি জুতো; মুক্তো আর ফুল দিয়ে নকশা করা সেই ছোট্ট, শৌখিন জুতো—যা একসময় তার সুন্দরী মালকিনের ছিল। কো-নগাই যখন ঝাঁপ দিচ্ছিল দাসীটি তার পা ধরার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু সে শুধু জুতোটিই ধরতে পেরেছিল; আর সে পাগলের মতো সেটির দিকে তাকিয়ে রইল।
এত কিছুর পরেও, স্বর্গীয় মহানুভবের আদেশ পালন করতেই হলো এবং ঢালাইয়ের কাজ শেষ করতে হলো—তা সে ফলাফল যত হতাশাজনকই হোক না কেন। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হলো, ধাতুর উজ্জ্বলতা আগের চেয়ে অনেক বেশি খাঁটি আর সাদা মনে হলো। ভারী ঢালাইয়ের কাজ শেষ হলো। আর কী আশ্চর্য! ধাতু ঠান্ডা হওয়ার পর দেখা গেল, ঘণ্টাটি দেখতে যেমন অপূর্ব, গঠনেও তেমনি নিখুঁত এবং এর রং অন্য সব ঘণ্টার চেয়ে বিস্ময়কর। কো-নগাইয়ের দেহের কোনো চিহ্নই পাওয়া গেল না, কারণ তা সেই মূল্যবান সংকর ধাতুর সঙ্গে পুরোপুরি মিশে গিয়েছিল—সোনা, পিতল, রুপা আর লোহার সেই অপূর্ব মিলনের সাথে একাকার হয়ে গিয়েছিল।
আর যখন তারা ঘণ্টাটি বাজাল, তখন দেখা গেল তার আওয়াজ অন্য যেকোনো ঘণ্টার চেয়ে গভীর, মধুর এবং শক্তিশালী—এমনকি একশো 'লি' দূর থেকেও তা শোনা গেল, যেন গ্রীষ্মের বজ্রপাতের গর্জন; আর তবুও সেই আওয়াজ যেন কোনো এক বিশাল কণ্ঠস্বর, যা একটি নাম উচ্চারণ করছে, এক নারীর নাম—"কো-নগাই!"
আর আজও, সেই প্রতিটি শক্তিশালী আঘাতের মাঝখানের বিরতিতে এক দীর্ঘ ও চাপা হাহাকার শোনা যায়; আর সেই গোঙানি শেষ হয় এক ফোঁপানি ও অভিযোগের সুরে, ঠিক যেন কোনো কান্নারত নারী ফিসফিস করে বলছে, "হিয়াইইই…!" আজও যখন মানুষ সেই বিশাল সোনালি গোঙানি শোনে, তখন তারা নীরব হয়ে যায়; কিন্তু যখন বাতাসে সেই তীব্র, মিষ্টি শিহরণ ভেসে আসে এবং "হিয়াইইই…!" শব্দের ফোঁপানি শোনা যায়, তখন পিকিং শহরের রঙিন গলিগুলোর সব চীনা মায়েরা তাদের ছোট শিশুদের কানে ফিসফিস করে বলে—"শোনো! ওই যে কো-নগাই তার জুতোর জন্য কাঁদছে! ওই যে কো-নগাই তার হারানো জুতো ফেরত চাইছে!"
লর্ড ডানসানি এর দ্য হোর্ড অব দ্য গিবেলিনস (The Hoard of the Gibbelins) রূপান্তর মেহেদী হাসান
এডওয়ার্ড জন মোরটন ড্র্যাক্স প্লাঙ্কেট (যিনি সাহিত্যজগতে লর্ড ডানসানি নামে পরিচিত) ছিলেন একজন অ্যাংলো-আইরিশ লেখক, নাট্যকার এবং আধুনিক ফ্যান্টাসি সাহিত্যের পথিকৃৎদের একজন। আয়ারল্যান্ডের প্রাচীনতম অভিজাত বংশগুলোর একটিতে জন্মগ্রহণকারী ডানসানি ট্রিনিটি কলেজ থেকে সম্মানসূচক ডক্টরেট লাভ করেন। "দ্য হোর্ড অব দ্য গিবেলিনস" লর্ড ডানসানির রচিত একটি ফ্যান্টাসি ছোটগল্প। এটি প্রথম প্রকাশিত হয় লন্ডনের দ্য স্কেচ পত্রিকায় ১৯১১ সালে এবং পরবর্তীতে ১৯১২ সালে তাঁর বিখ্যাত সংকলন দ্য বুক অব ওয়ান্ডার-এ অন্তর্ভুক্ত হয়।
---------------------------------------------------------
দ্য হোর্ড অব দ্য গিবেলিনস
- লর্ড ডানসানি
গিবলিনরা যে মানুষ ছাড়া আর কিছুই খায় না এ কথা সবাই জানে। তাদের সেই অশুভ দুর্গটি আমাদের চিরচেনা পৃথিবীর সাথে শুধুমাত্র একটি সেতুর মাধ্যমে যুক্ত আছে। তাদের ধনসম্পদের কোনো হিসাব নেই; এত বেশি যে লোভের বশবর্তী হয়েও এই পরিমান সম্পদ কাজে লাগানো সম্ভব নয়। পান্নার জন্য আলাদা গুদাম, নীলকান্তমণির জন্য আলাদা গুদাম; এমনকি তারা একটি গর্ত সোনা দিয়ে ভর্তি করে রেখেছে এবং যখন প্রয়োজন হয় তখন খুঁড়ে বের করে। আর তাদের এই বিশাল সম্পদের একটাই ব্যবহার, তা হলো—মানুষকে ফাঁদে ফেলা। দুর্ভিক্ষের সময় তো তারা আরও ভয়ংকর কাজ করত। তারা কোন একটি শহরে মানুষদের চলার পথে রুবি বা চুনি পাথর ছড়িয়ে দিত, ফলে মানুষেরা লোভের বশবর্তী হয়ে তাদের ফাঁদে পা দিত; আর বলাই বাহুল্য, শীঘ্রই গিবলিনদের খাবারের গুদাম পুনরায় ভরে উঠত।
হোমার যে নদীকে 'পৃথিবী বেষ্টনকারী মহাসমুদ্র' বলে অভিহিত করেছিলেন, সেই নদীর ওপারেই দাঁড়িয়ে আছে তাদের দুর্গ। যেখানে নদীটা সরু আর হেঁটে পার হওয়া যায় সেখানেই গিবলিনদের পেটুক পূর্বপুরুষরা এই দুর্গটি নির্মাণ করেছিল; কারণ তারা চাইত রত্ন চোরেরা সহজে নৌকা বেয়ে এসে তাদের সিঁড়ির গোঁড়ায় পৌঁছাক।
এই দুর্গেই গিবলিনরা বসবাস করত আর জঘন্যভাবে মানুষ খেয়ে বেঁচে থাকত। আলডেরিক, যিনি ছিলেন 'অর্ডার অফ দ্য সিটি অ্যান্ড দ্য অ্যাসল্ট' এর একজন নাইট—রূপকথার গল্পকারদের কাছে যিনি বেশ পরিচিত নাম। গিবলিনদের সেই গুপ্তধনের কথা এত দীর্ঘ সময় ধরে ভেবেছেন যে, এখন তিনি সেগুলো নিজের সম্পত্তি বলেই মনে করেন।
হায়! গভীর রাতে কোন এক সাহসী মানুষ যে ভয়ানক অভিযানে নেমেছিল, তার পেছনের একমাত্র কারণ ছিল নিছক লোভ—এ কথা ভাবতেই খারাপ লাগে! কিন্তু গিবলিনরা তাদের খাবারের গুদাম পূর্ণ রাখতে মানুষের এই লোভের ওপরই ভরসা করত। প্রতি একশো বছরে একবার তারা মানুষের শহরে গুপ্তচর পাঠাত এটা দেখতে যে মানুষের লোভের অবস্থা কেমন; আর প্রতিবারই গুপ্তচরেরা দুর্গে ফিরে এসে জানাত যে সব ঠিকঠাক আছে।
মনে হতে পারে যে, বছরের পর বছর ধরে ওই দুর্গের ভেতরে মানুষের এমন ভয়ানক পরিণতির কথা জানাজানি হওয়ার পর গিবলিনদের খাবার টেবিলে মানুষের আনাগোনা কমে যাওয়ার কথা; কিন্তু গিবলিনদের অভিজ্ঞতা ছিল ঠিক তার উল্টো।
যৌবনের উন্মাদনায় আলডেরিক সেই দুর্গে আসেননি। তিনি বছরের পর বছর ধরে অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে সবকিছু পর্যবেক্ষণ করেছেন, কীভাবে চোরেরা তাদের নিজের বলে দাবি করা সেই সম্পদের খোঁজে গিয়ে অকালমৃত্যুর মুখে পড়েছে। প্রতিটি ক্ষেত্রে দেখা গেছে, তারা দরজা দিয়েই প্রবেশ করেছিল।
যারা এই অভিযানের বিষয়ে পরামর্শ দিত, তিনি তাদের সাথে শলাপরামর্শ করলেন; প্রতিটি খুঁটিনাটি বিষয় টুকে নিলেন এবং হাসিমুখে তাদের পারিশ্রমিক মিটিয়ে দিলেন। কিন্তু মনে মনে ঠিক করলেন, তারা যা পরামর্শ দিয়েছে তার কোনোটাই তিনি করবেন না। কারণ তাদের মক্কেলদের বর্তমান অবস্থা কী? বরং তারাতো এখন গিবলিনদের সুস্বাদু খাবারে পরিনত হয়েছে।
এই অভিযানের জন্য ওই উপদেষ্টারা সাধারণত যেসব জিনিসের পরামর্শ দিত তা হলো: একটি ঘোড়া, একটি নৌকা, লোহার বর্ম আর অন্তত তিনজন সৈনিক সাথে নিতে। কেউ বলত, "দুর্গের দরজায় গিয়ে শিঙায় ফুঁ দিও"; আবার কেউ বলত, "খবরদার, ওটা স্পর্শ কোরো না।"
আলডেরিক তাই সিদ্ধান্ত নিলেন: তিনি নদীর পাড় পর্যন্ত কোনো ঘোড়া নিয়ে যাবেন না, নৌকায় করে নদী পাড়ি দেবেন না, এবং তিনি একাই যাবেন—যে পথে কেউ যায় না, অর্থাৎ সেই দুর্ভেদ্য জঙ্গলের পথ ধরে।
আপনার মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, যা দুর্ভেদ্য বা পার হওয়া অসম্ভব, তা তিনি পার হবেন কী করে? তার পরিকল্পনা ছিল এরকম: তিনি এমন এক ড্রাগনের কথা জানতেন যে শুধু অসংখ্য কুমারীকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করার জন্যই নয়, বরং ফসলের ব্যাপক ক্ষতি করার জন্যও সে কুখ্যাত ছিল; সে ওই পুরো অঞ্চলকে তছনছ করে দিয়েছিল। মূলত সে পুরো রাজ্যের জন্য ছিল অভিশাপ।
আলডেরিক এবার সেই ড্রাগনের মুখোমুখি হওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। তাই তিনি ঘোড়া আর বর্শা নিয়ে ছুটলেন যতক্ষণ না ড্রাগনটির মুখোমুখি হলেন, আর ড্রাগনটিও তিক্ত ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে তাকে আক্রমণ করতে বেরিয়ে এল।
তাকে দেখে আলডেরিক চিৎকার করে বললেন, "কোনো পিশাচ ড্রাগন কি কখনো কোনো সাচ্চা নাইটকে হত্যা করতে পেরেছে?" ড্রাগনটি ভালো করেই জানত যে এমনটা কখনো ঘটেনি, তাই সে মাথা নিচু করে চুপ করে রইল; কারণ ইতোপূর্বে রক্তপানে তার তৃষ্ণা মিটে গিয়েছিল।
তারপর নাইট বললেন, "শোনো, যদি তুমি আবার কখনও কোনো কুমারীর রক্তের স্বাদ পেতে চাও, তাহলে আজ থেকে তুমি হবে আমার বিশ্বস্ত বাহন—আমার ঘোড়া। আর যদি তা না চাও, তবে এই বর্শার শপথ করে বলছি, তোমার জাতির যে ভয়ংকর পরিণতির কথা গায়করা বলে বেড়ায়, সেই সবকিছুই তোমার ওপর নেমে আসবে।"
কথাটি শুনে সে রাগান্বিত হল না, কিংবা আগুনের শ্বাস ফেলতে ফেলতে নাইটকে আক্রমণ করতেও ধেয়ে এল না। কারণ যারা এসব দুঃসাহস দেখিয়েছে তাদের কী পরিণতি হয়েছে তা সে ভালো করেই জানত। তাই সে নাইটের দেওয়া সব শর্ত মেনে নিল এবং শপথ করে বলল যে আজ থেকে সে তার বিশ্বস্ত বাহন হবে।
এই ড্রাগনের পিঠে জিন চড়িয়েই আলডেরিক পরে সেই দুর্ভেদ্য জঙ্গলের ওপর দিয়ে উড়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু তার আগে তিনি তার সেই সূক্ষ্ম পরিকল্পনাটি নিয়ে গভীর চিন্তাভাবনা করলেন। তিনি এক কামারকে হুকুম দিলেন, আর সেই কামার তার জন্য একটি লোহার কোদাল বানিয়ে দিল।
আলডেরিকের এই অভিযানের খবর ছড়িয়ে পড়তেই মানুষের মধ্যে আনন্দের বন্যা বয়ে গেল। কারণ সবাই জানত তিনি একজন অত্যন্ত সতর্ক মানুষ, তাই তাদের বিশ্বাস ছিল তিনি সফল হবেন এবং পৃথিবীকে ধনসম্পদে ভরিয়ে দেবেন। এই মহৎ দানের কথা ভেবে শহরের লোকেরা খুশিতে হাত ঘষতে লাগল। তার দেশে শুধু সুদখোররা বাদে প্রায় সবাই খুশি ছিল। তারা ভয় পাচ্ছিল কারণ আলডেরিক ফিরে এলে হয়তো তাদের পাওনা টাকা শোধ হয়ে যাবে। আরও একটা কারণে সবাই খুশি ছিল—যদি গিবলিনদের ধন লুট হয় তবে তারা হয়তো তাদের উঁচু সেতু ভেঙে ফেলবে আর নিজেদের দুর্গসহ যেখান থেকে তারা এসেছিল সেখানে অর্থাৎ চাঁদে ফিরে যাবে। গিবলিনদের প্রতি মানুষের ভালোবাসার লেশমাত্র ছিল না, যদিও সবাই তাদের গুপ্তধনের প্রতি ঈর্ষান্বিত ছিল।
তাই যেদিন তিনি ড্রাগনের পিঠে চড়লেন, সেদিন সবাই এমনভাবে উল্লাস করতে লাগল যেন তিনি ইতিমধ্যেই বিজয়ী হয়ে ফিরেছেন। আর লোকদের সবচেয়ে বেশি আনন্দ হয়েছিল এই দেখে যে, তিনি যাত্রাপথে সোনা ছড়িয়ে দিচ্ছিলেন। তিনি বললেন, গিবলিনদের গুপ্তধন পেলে এসবের আর দরকার হবে না; আর যদি তিনি গিবলিনদের খাবারে পরিণত হন, তবে তো এগুলোর চিন্তা করা একদমই বৃথা।
যখন লোকেরা শুনল যে তিনি উপদেষ্টাদের কথা শোনেননি, তখন কেউ বলল নাইট পাগল হয়ে গেছেন; আবার কেউ বলল তিনি পরামর্শদাতাদের চেয়েও বড় মাপের মানুষ। কিন্তু কেউই তার পরিকল্পনার আসল মাহাত্ম্য বুঝতে পারল না।
তার যুক্তি ছিল এই রকম: শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মানুষ বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ মেনে সবচেয়ে চতুর পথে সেখানে গেছে। এদিকে গিবলিনরাও অভ্যাস করে ফেলেছে যে মানুষ নৌকা করেই আসবে, আর যখন তাদের খাবারের গুদাম খালি হবে তখন তারা দরজার দিকেই তাকিয়ে থাকবে—যেমন করে কোন শিকারি জলাভূমিতে কাদা-খোঁচা পাখির খোঁজ করে।
কিন্তু আলডেরিক বললেন, "যদি পাখিটি কোনো গাছের মগডালে বসে থাকে, তবে কি মানুষ তাকে খুঁজে পাবে? কখনোই না!" তাই আলডেরিক সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি নদী সাঁতরে পার হবেন এবং দরজা দিয়ে ঢুকবেন না, বরং কোদাল দিয়ে দেয়ালের পাথর খুঁড়ে দুর্গের ভেতরে ঢুকবেন। তাছাড়া তার পরিকল্পনা ছিল সমুদ্রপৃষ্ঠের নিচে কাজ করা। তার উদ্দেশ্য ছিল, দেয়ালে ফুটো করলেই যেন পানি হুড়মুড় করে ভেতরে ঢুকে পড়ে গিবলিনদের ভড়কে দেয় এবং তাদের বিশ ফুট গভীর ভূগর্ভস্থ গুদামগুলো বন্যায় ভাসিয়ে দেয়; আর তখন তিনি মুক্তার সন্ধান করা ডুবুরির মতো পান্না কুড়িয়ে নেবেন।
সেদিন তিনি পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী তার ঘোড়া (বা বলা ভালো ড্রাগন) ছুটিয়ে বাড়ি থেকে দুহাতে সোনা ছড়াতে ছড়াতে বেরিয়ে পড়লেন। তিনি অনেক রাজ্য পার হলেন; পথে ড্রাগনটা কুমারী মেয়েদের দেখে কামড়াতে যাচ্ছিল, কিন্তু মুখের লাগামের কারণে খেতে পারছিল না। এর বদলে তাকে খেতে হচ্ছিল নাইটের বর্শার খোঁচা। এভাবে তারা সেই দুর্ভেদ্য জঙ্গলের কালো, গগনচুম্বী দেয়ালের মতো গাছের সারির কাছে এসে পৌঁছাল। ডানার ঝাপটানি দিয়ে ড্রাগনটি উঁচুতে উঠে গেল। পৃথিবীর প্রান্তে বসবাসকারী অনেক কৃষক গোধূলির আলোয় ওপরে তাকাতেই এক আবছা, কালো, আঁকাবাঁকা রেখা দেখতে পেল। তারা ওটাকে সমুদ্র থেকে উড়ে আসা বুনো হাঁসের সারি ভেবে ভুল করল এবং শীত আসছে, শীঘ্রই বরফ পড়বে—এই ভেবে হাত ঘষতে ঘষতে হাসিমুখে ঘরে ঢুকে গেল।
কিছুক্ষণ পর গোধূলি মিলিয়ে গেল আর তারা যখন পৃথিবীর কিনারায় নামল তখন রাত হয়ে গেছে এবং আকাশে চাঁদ জ্বলজ্বল করছে। সেই প্রাচীন মহাসাগর নিঃশব্দে বয়ে যাচ্ছিল। গিবলিনরা ভোজসভায় মত্ত ছিল নাকি দরজায় পাহারা দিচ্ছিল—তা বোঝার উপায় ছিল না, কারণ তারাও কোনো শব্দ করছিল না। আলডেরিক ড্রাগন থেকে নামলেন এবং তার বর্ম খুলে ফেললেন। তারপর নিজের প্রিয়তমার উদ্দেশ্যে একবার প্রার্থনা করে কোদাল হাতে সাঁতরে নদী পার হলেন। তলোয়ারটি হাতছাড়া করলেন না, পাছে কোনো গিবলিনের সাথে দেখা হয়ে যায়।
ওপারে পৌঁছে তিনি সাথে সাথেই কাজ শুরু করলেন এবং সবকিছু ঠিকঠাক মতোই এগোতে লাগল। কোনো জানালা দিয়ে কেউ উঁকি দিল না; সবগুলো জানালাই আলোকিত ছিল, ফলে ভেতরের আলোয় থাকা কেউ বাইরের অন্ধকারে তাকে দেখতে পাচ্ছিল না। কোদালের আঘাতের শব্দ মোটা দেয়ালে চাপা পড়ে যাচ্ছিল। সারা রাত তিনি কাজ করলেন, কোনো শব্দ তাকে বিরক্ত করল না। ভোরের আলো ফুটতেই শেষ পাথরটি নড়ে উঠে ভেতরের দিকে পড়ে গেল, আর তার পেছন পেছন নদীর পানি হুড়মুড় করে ঢুকতে লাগল। তখন আলডেরিক একটা পাথর নিলেন এবং নিচের ধাপের দিকে গিয়ে সেটা সজোরে দরজার দিকে ছুড়ে মারলেন। তিনি শুনলেন পাথরের প্রতিধ্বনি দুর্গের ভেতরে ছড়িয়ে পড়ছে; এরপর তিনি দৌড়ে ফিরে এসে দেয়ালের সেই গর্ত দিয়ে ভেতরে ডুব দিলেন।
তিনি পান্নার গুদামে এসে পরলেন। তার মাথার ওপরের উঁচু ছাদের নিচে কোনো আলো ছিল না, কিন্তু বিশ ফুট পানির নিচে ডুব দিয়ে তিনি অনুভব করলেন মেঝেটা পান্নায় ভর্তি হয়ে আছে, আর সেখানে খোলা সিন্দুকগুলোও রত্নে ঠাসা। চাঁদের আবছা আলোয় তিনি দেখলেন পান্নার আভায় পানি সবুজ হয়ে আছে। সহজেই তিনি একটি থলি ভর্তি করে আবার পানির ওপরে ভেসে উঠলেন; আর ঠিক তখনই দেখলেন গিবলিনরা হাতে মশাল নিয়ে কোমর সমান পানিতে দাঁড়িয়ে আছে! তারা কোনো কথা বলল না, এমনকি হাসলও না। তারা খুব নিপুণভাবে তাকে বাইরের দেয়ালে ঝুলিয়ে দিল—আর বলাই বাহুল্য, এই গল্পের শেষটা খুব একটা সুখকর ছিল না।
অ্যামব্রোজ বিয়ার্স এর অ্যান অকারেন্স অ্যাট আউল ক্রিক ব্রিজ (An Occurrence at Owl Creek Bridge) রূপান্তর মেহেদী হাসান
অ্যামব্রোজ গুইনেট বিয়ার্স ছিলেন একজন আমেরিকান ছোটগল্প লেখক, সাংবাদিক, কবি এবং আমেরিকান সিভিল ওয়ারের সৈনিক। তার বিখ্যাত গল্প "অ্যান অকারেন্স অ্যাট আউল ক্রিক ব্রিজ" প্রথম প্রকাশিত হয় ১৮৯০ সালের ১৩ই জুলাই দ্য সান ফ্রান্সিসকো এক্সামিনার পত্রিকায় এবং পরে "টেলস অফ সোলজার্স অ্যান্ড সিভিলিয়ান্স" (১৮৯১) সংকলনে এটি স্থান পায়। এই সংকলনটি দুটি ভাগে বিভক্ত—"সোলজার্স" এবং "সিভিলিয়ান্স"। এই নির্দিষ্ট গল্পটি "সোলজার্স" অংশের অন্তর্ভুক্ত।
____________________
অ্যান অকারেন্স অ্যাট আউল ক্রিক ব্রিজ
— অ্যামব্রোজ বিয়ার্স
পর্বঃ এক
আমেরিকার উত্তর আলাবামার এক রেলসেতুর উপর দাঁড়িয়ে একজন লোক তার নিচের বিশ ফুট দূরে দ্রুত প্রবাহমান পানির দিকে তাকিয়ে ছিল। লোকটির হাত পিছনে নিয়ে কব্জিগুলো দড়ি দিয়ে শক্ত করে বাঁধা। তার গলায় শক্ত করে পেঁচানো একটি দড়ি যা তার মাথার উপরকার একটি মোটা ক্রসবারের সাথে যুক্ত এবং দড়ির ঢিলে অংশ তার হাঁটু পর্যন্ত নেমে এসেছে।
রেললাইনের ওপর রাখা কিছু আলগা তক্তা দিয়ে তার এবং মৃত্যুদণ্ড কার্যকরকারীদের জন্য দাঁড়ানোর জায়গা তৈরি করা হয়েছে। বেসামরিক জীবনে ডেপুটি শেরিফ হিসেবে কর্মরত থাকা একজন সার্জেন্ট, ফেডারেল সেনাবাহিনীর দুইজন প্রাইভেট সৈনিককে বিভিন্ন নির্দেশ দিচ্ছিলেন। একই অস্থায়ী প্ল্যাটফর্মে কিছুটা দূরে বিশেষ পদমর্যাদার ইউনিফর্ম পরিহিত একজন সশস্ত্র অফিসার দাঁড়িয়ে ছিলেন। তিনি একজন ক্যাপ্টেন। সেতুর দুই প্রান্তে একজন করে প্রহরী তাদের রাইফেল তাক করে দাঁড়িয়ে ছিল অর্থাৎ বাম কাঁধের সামনে উল্লম্বভাবে, রাইফেলের হাতল সোজা বুকের উপর প্রসারিত বাহুর উপর রাখা—এটি একটি আনুষ্ঠানিক ও অস্বাভাবিক ভঙ্গি যা দেহকে সম্পূর্ণ সোজা রাখতে বাধ্য করে। সেতুর দুই প্রান্ত অবরোধ করে রাখাই তাদের দায়িত্ব—মাঝখানে কী ঘটছে তা তাদের জানার প্রয়োজন নেই।
একজন প্রহরী ছাড়া আর কাউকে দেখা যাচ্ছিল না; রেললাইনটি সোজা একশ গজ বনের মধ্যে চলে গিয়ে বাঁক নিয়ে চোখের আড়ালে অদৃশ্য হয়ে গেছে। সম্ভবত আরও দূরে কোনো আউটপোস্ট ছিল। নদীর অপর পাড়ে খোলা মাঠের মধ্যে ঢালের ওপরে খাড়াখাড়ি গাছের গুঁড়ি দিয়ে তৈরি একটি বেড়া যার মধ্যে রাইফেলের লুপহোল করা আর একটি মাত্র ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে আছে সেতুর দিকে তাক করা পিতলের কামানের নল।
কৌতূহলী দর্শকরা সেতু ও দুর্গের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে। পদাতিক বাহিনীর একটি দল প্যারেড রেস্ট অবস্থায় রাইফেলের বাট মাটিতে; ব্যারেলগুলি ডান কাঁধের উপর পিছনে হেলান দিয়ে আর হাতগুলো স্টকের উপর আড়াআড়ি রেখে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছে। সারির ডানদিকে বাম হাত ডান হাতের উপর আর তলোয়ারের ডগা মাটিতে গেঁথে একজন লেফটেন্যান্ট দাঁড়িয়ে আছেন। সেতুর মাঝখানে থাকা চারজন ছাড়া একটি মানুষও নড়ছিল না। সমস্ত জটলা সেতুর দিকে মুখ করে পাথরের মতো স্থির নিস্পলক তাকিয়ে ছিল। নদী পাড়ের দিকে মুখ করে থাকা প্রহরীগুলো মূর্তির মতো নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। ক্যাপ্টেন বাহু গুটিয়ে নীরবে দাঁড়িয়ে অধীনস্থদের কাজ পর্যবেক্ষণ করছিলেন—কোনো সংকেত দিচ্ছিলেন না। মৃত্যু যেন এক মর্যাদাসম্পন্ন অতিথি যার আগমন ঘোষণা করা হলে তাকেও সম্মানের সঙ্গে গ্রহণ করতে হয়—এমনকি যারা তার সাথে সবচেয়ে বেশি পরিচিত তারাও। সামরিক শিষ্টাচারের নিয়মে নীরবতা ও নিশ্চলতা হচ্ছে শ্রদ্ধার বহিঃপ্রকাশ।
যে লোকটির ফাঁসি কার্যকর হতে চলেছিল তার বয়স সম্ভবত পঁয়ত্রিশের মতো। বেশভূষা দেখে মনে হচ্ছিল তিনি একজন বেসামরিক ব্যক্তি—সম্ভবত একজন চাষী। সোজা নাক, দৃঢ় মুখমণ্ডল ও প্রশস্ত কপালের একজন সুশ্রী পুরুষ। পিছনের দিকে আঁচড়ানো লম্বা কালো চুলগুলো কানের পাশ দিয়ে তার সুবিন্যস্ত ফ্রক কোটের কলার পর্যন্ত নেমে এসেছে। গোঁফ ও সূঁচালো দাড়ি থাকলেও কোন জুলফি নেই। গাঢ় ধূসর বর্ণের বড় বড় চোখ দুটুতে এক সদয় অভিব্যক্তি ফুটে উঠছিল যা সাধারণত ফাঁসির দড়িতে ঝুলন্ত ব্যক্তির মধ্যে আশা করা যায় না। স্পষ্টতই ইনি কোনো সাধারণ খুনি ছিলেন না। উদার সামরিক বিধিমালায় অনেক প্রকারের লোকের ফাঁসির ব্যবস্থা আছে এবং ভদ্রলোকরাও এর বাইরে নয়।
প্রস্তুতি সম্পন্ন হওয়ার পর দুইজন সৈনিক একপাশে সরে দাঁড়িয়ে আলগা তাক্তাগুলো সরিয়ে নিল। সার্জেন্ট ক্যাপ্টেনের দিকে ঘুরে স্যালুট করল এবং সেই অফিসারের ঠিক পিছনে গিয়ে দাঁড়াল। এই গতিবিধির ফলে দণ্ডিত লোকটি এবং সার্জেন্ট একই তক্তার দুই প্রান্তে দাঁড়িয়ে রইল যেটা সেতুর তিনটি আড়াআড়ি কাঠকে সংযুক্ত করে ছিল। বেসামরিক ব্যক্তি যে প্রান্তে দাঁড়িয়েছিল সেটা চতুর্থ ক্রসবার পর্যন্ত পৌঁছেছিল। এই তক্তাটি ক্যাপ্টেনের ওজনে এতক্ষণ স্থির ছিল; এখন সেটি সার্জেন্টের ওজনে স্থির রইল। ক্যাপ্টেনের ইশারায় সার্জেন্ট সরে গেলে তক্তাটি কাত হয়ে যাবে এবং দণ্ডিত লোকটি দুটি ক্রসবারের মাঝখান দিয়ে নিচে পড়ে যাবে। এই ব্যবস্থা তার বিচার অনুযায়ী সহজ এবং কার্যকর মনে হয়েছিল। তার মুখ বা চোখ কোনটাই বাঁধাও হয়নি। সে এক মুহূর্ত তার পায়ের নিচ দিয়ে উন্মত্ত বেগে বয়ে চলা নদীর ঘূর্ণায়মান পানির দিকে তাকাল। কাঁপতে থাকা ভাসমান কাঠের একটি টুকরো তার দৃষ্টি আকর্ষণ করল এবং তার চোখ স্রোতের সাথে সেটাকে অনুসরণ করল। কত ধীর গতিতে এটি চলছিল! কী অলস স্রোত!
স্ত্রী ও সন্তানদের কথা শেষবারের মতো স্মরণ করার জন্য সে চোখ বন্ধ করল। ভোরের সূর্যের স্পর্শে সোনালি হয়ে ওঠা জলরাশি, নদীতীরের কিছু দূরবর্তী স্থানে জমে থাকা ঘন কুয়াশা, কেল্লা, সৈন্যদল, আর সেই ভাসমান কাঠের টুকরো - সবকিছুই তার মনোযোগে বাধা দিচ্ছিল। এবার সে নতুন এক গোলমালের আভাস পেল; প্রিয়জনের স্মৃতির মাঝেই হঠাৎ একটি তীক্ষ্ণ স্পষ্ট ধাতব শব্দ কানে এল—যেন কামারের হাতুড়ি নেহাইয়ের উপর পড়ছে। সে ভাবল এটা কী? খুব দূরে নাকি একেবারে কাছে? যদিও দুটোই মনে হচ্ছিল। শব্দটি মৃত্যুর ঘণ্টাধ্বনির মত ধীরে ধীরে কিন্তু নিয়মিত বিরতিতে হচ্ছিল। প্রতিবার নতুন শব্দের জন্য সে অধৈর্য হয়ে অপেক্ষা করছিল এবং কেন জানি না—ভয়ে শঙ্কিত হচ্ছিল। নীরবতার বিরতি ক্রমশ দীর্ঘ হতে লাগল; প্রতীক্ষা তাকে পাগল করে তুলছিল। শব্দের ধারাবাহিকতা কমার সাথে সাথে সেটা আরও জোরালো ও তীক্ষ্ণ হয়ে উঠছিল। এগুলো ছুরির আঘাতের মতো কানে খোঁচা মারছিল; তার মনে হচ্ছিল সে চিৎকার করে উঠবে। আসলে সে তার নিজের ঘড়ির টিকটিক শব্দ শুনছিল।
চোখ খুলে আবার সে নিচের জলরাশির দিকে তাকাল। "যদি হাত ছাড়াতে পারতাম" সে ভাবল, "তাহলে হয়ত ফাঁস খুলে নদীতে ঝাঁপিয়ে পরতাম। ডুব দিয়ে গুলি এড়িয়ে সজোরে সাঁতরে তীরে পৌঁছাতে পারতাম। তারপর জঙ্গলে ঢুকে বাড়ি পালাতে পারতাম। আল্লাহকে ধন্যবাদ যে আমার বাড়ি এখনও শত্রুদের সীমানার বাইরে; আমার স্ত্রী ও ছোট্ট সন্তানরা এখনও আক্রমণকারীদের শেষ সীমান্তেরও ওপারে।"
এই ভাবনাগুলো সেই দণ্ডিত লোকটির মস্তিষ্কে বিদ্যুৎ ঝলকের মতো খেলে গেল আর ঠিক সেই মুহূর্তে ক্যাপ্টেন সার্জেন্টের দিকে ইঙ্গিত করায় সার্জেন্ট একপাশে সরে দাঁড়াল।



