- Back to Home »
- সেবা প্রকাশনীর পুরনো জৌলুস কি ফিরিয়ে আনা সম্ভব?
সেবা বই
প্রিয় বই
অবসরের সঙ্গী।
নব্বই দশকের পাঠকদের কাছে সেবা শুধু একটি প্রকাশনী নয়, এটি এক আবেগের নাম, শৈশবের রোমাঞ্চকর স্মৃতির ভাণ্ডার। কাজী আনোয়ার হোসেন শুধু একজন প্রকাশক বা লেখক ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন 'মেন্টর' যিনি তরুণ লেখকদের তৈরি করতেন। তার শূন্যস্থান অপূরণীয়। কাজীদার অবর্তমানে সেবার যে কাঠামোগত এবং মানগত সংকট তৈরি হয়েছে, তা কমবেশি আমরা সবাই অবগত। তারপরেও এই ক্ষুদ্র পাঠকের মনে একটি প্রশ্ন উঁকি দিচ্ছে - সেবার পুরনো জৌলুস কি ফিরিয়ে আনা সম্ভব?
সেবাকে ঘিরে এত বড় একটি অনুগত কমিউনিটি এখনো টিকে আছে, এটাই সবচেয়ে বড় শক্তি। এই কমিউনিটিকে কাজে লাগিয়ে কিছু কার্যকরী উদ্যোগ নেওয়া গেলে সেবা হয়তো তার হারানো জৌলুস ফিরে পেতে পারে। এই ব্যাপারে আমার ব্যক্তিগত অভিমত আপনাদের সাথে শেয়ার করতে চাই।
কর্পোরেট ম্যানেজমেন্ট এবং প্রফেশনাল টিম নিয়োগঃ
কাজীদার মতো একজন ভিশনারি ছাড়া এরকম প্রকাশনা সংস্থা চালানো কঠিন, তাই বর্তমানে সেবা প্রকাশনীকে একটি কর্পোরেট মডেলে আনা উচিত। লেখা নির্বাচন এবং সম্পাদনার জন্য একটি প্রফেশনাল এডিটোরিয়াল বোর্ড গঠন করা প্রয়োজন।
বইয়ের মান ও প্রোডাকশন উন্নত করাঃ
কোয়ালিটি কন্ট্রোল টিম গঠন করে প্রতিটি বই ছাপানোর আগে সম্পাদনা, প্রুফরিডিং, প্রিন্ট কোয়ালিটি এবং বাঁধাই নিশ্চিত করতে হবে। বর্তমানে সেবার বইয়ের বাঁধাই খুবই নাজুক। একবার পড়লেই পাতা খসে পড়ে। পাঠকরা মানসম্মত কিছু চায়। সেবাকে অবিলম্বে তাদের প্রিন্টিং পার্টনার পরিবর্তন করতে হবে অথবা কঠোর কোয়ালিটি কন্ট্রোল মেনে চলতে হবে। পূর্বের মতো প্রতিটি বইয়ের শেষে “পাঠকদের মতামত” সেকশন রাখা যেতে পারে। এটা খুব মিস করি।
সিরিজ সম্প্রসারণ ও নতুন ঘরানা তৈরিঃ
পুরনো সিরিজের ধারাবাহিকতা রক্ষার ক্ষেত্রে সম্পাদনা খুব জরুরী। ওয়েস্টার্ন, মাসুদ রানার ক্ষেত্রে আমরা বিভিন্ন লেখক দেখতে পাচ্ছি, যার ফলে নতুন নতুন বই পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু সেবার সর্বাধিক জনপ্রিয় ঘরানা তিন গোয়েন্দার ক্ষেত্রে এরকম দেখছি না, শুধু হাউস নেম ব্যবহার হচ্ছে। পাঠক রিয়েকশন থেকে বোঝা যাচ্ছে "শানের" অধিকাংশ বই মানসম্মত নয়। কাহিনী ভালো হলেও শুধুমাত্র হাউস নেম থাকার কারনে অনেক পাঠক হয়তো বইটি ক্রয় করছেন না। সুতরাং তিন গোয়েন্দাও বিভিন্ন লেখকের নামে প্রকাশ করা যেতে পারে। এছাড়াও মেয়ে প্রোটাগনিস্ট সিরিজ শুরু করা যেতে পারে। সেবার প্রায় সব সিরিজেই ছেলে চরিত্র প্রধান। মেয়ে পাঠকদের কথা মাথায় রেখে শক্তিশালী নারী চরিত্রকেন্দ্রিক সিরিজ চালু করলে পাঠক বেস অনেক বড় হবে।
নতুন লেখক সৃষ্টিঃ
সেবা প্রকাশনীর সবচেয়ে বড় শক্তি হচ্ছে তার নিজস্ব স্টাইল বা 'সেবা ঘরানা'। বছরে ২ বার "সেবা থ্রিলার বা রহস্যগল্প প্রতিযোগিতা" আয়োজন করা যায়। সেরা পাণ্ডুলিপিগুলোকে শুধু পুরস্কার দেওয়াই নয়, বরং কাজীদা যেভাবে পাণ্ডুলিপি ঘষেমেজে সম্পাদনা করে লেখকদের তৈরি করতেন, সেভাবে অভিজ্ঞদের মাধ্যমে নতুনদের গ্রুমিং করতে হবে। এতে কন্টেন্ট পাইপলাইন তৈরি হবে এবং নতুন লেখকরাও অনুপ্রাণিত হবে। ফলশ্রুতিতে পাঠকরা নতুন বইও পাবে এবং সেবার নিজস্ব স্বাদও বজায় থাকবে। এছাড়াও নতুন লেখকদের জন্য যেকোনো সময় অনলাইনে পাণ্ডুলিপি জমা দেওয়ার সুযোগ রাখা যায়। বাংলাদেশে প্রচুর তরুণ লেখক আছে যারা সুযোগের অভাবে এগোতে পারছে না।
প্রি-অর্ডার বা ক্রাউডফান্ডিং মডেলঃ
পুরনো বেস্টসেলার বইগুলোর জন্য ক্রাউডফান্ডিং বা প্রি-অর্ডার সিস্টেম চালু করা যেতে পারে। ফেসবুক গ্রুপে ঘোষণা দিয়ে যখন ৫০০ বা ১০০০ জনের অগ্রিম টাকা ও অর্ডার নিশ্চিত হবে, কেবল তখনই বইটি প্রিন্ট করা যায়। এতে জিরো রিস্কে বই রিপ্রিন্ট করা সম্ভব। কোথায় যেন পড়েছিলাম, ২০০০ কপির কম ছাপালে লস। সেক্ষেত্রে আগে থেকেই পাঠকদের কাছ থেকে প্রি-অর্ডার নিতে হবে। ফেসবুক গ্রুপ বা ওয়েবসাইটের মাধ্যমে ঘোষণা দিলে সেবার পাঠক কমিউনিটি সাড়া দেবেই। ফেসবুক গ্রুপে ১০টি বইয়ের তালিকা দেয়া হবে। পাঠকরা ভোট দেবে কোন বইটি তারা সবচেয়ে বেশি রিপ্রিন্ট চান। যে বইটি প্রথমে নির্দিষ্ট সংখ্যক ভোট পাবে, শুধু সেটিই ছাপা হবে। এতে লসের ঝুঁকি থাকে না, এবং পাঠক মনে করে "এই বইটা আমার চেষ্টায় এসেছে"।
মার্কেটিং ও কমিউনিটি এনগেজমেন্টঃ
সেবার বইয়ের রিভিউ, লেখকদের সাক্ষাৎকার, পুরনো সিরিজের নস্টালজিয়া কন্টেন্ট - এগুলো ভাইরাল হওয়ার সম্ভাবনা রাখে। নিচে কিছু মার্কেটিং টেকনিক আলোকপাত করা হল।
"সেবা পাঠক উৎসব" আয়োজন
বছরে একবার ঢাকায় একটি সেবা-কেন্দ্রিক বই উৎসব করলে কমিউনিটি আরও জাগ্রত হবে। এটি মিডিয়া কভারেজও পাবে। এছাড়াও রকমারি/অন্যান্য প্ল্যাটফর্মে এক্সক্লুসিভ অফার দিয়ে মাসে একবার সেলস বুস্ট করা যেতে পারে।
নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছানো (চাইল্ড ডেভেলপমেন্ট ফোকাস)
৯০ দশকের পাঠকরা এখন প্রাপ্তবয়স্ক, অনেকেই এখন সন্তানের অভিভাবক। সেবা প্রকাশনী এই নস্টালজিয়াকে কাজে লাগিয়ে দারুণ একটি মার্কেটিং ক্যাম্পেইন করতে পারে। শিশুদের মোবাইল বা স্ক্রিন-আসক্তি কমানো এবং তাদের কগনিটিভ ও মানসিক বিকাশের জন্য সৃজনশীল বই পড়ার কোনো বিকল্প নেই। সেবা তাদের 'কিশোর ক্লাসিক' এবং 'তিন গোয়েন্দা' সিরিজগুলোকে শিশুদের রিডিং হ্যাবিট বা পড়ার অভ্যাস তৈরির টুল হিসেবে প্রোমোট করতে পারে। বাবা-মায়েরা তাদের নিজেদের শৈশবের প্রিয় বইগুলো সন্তানদের হাতে তুলে দিতে সবচেয়ে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করবেন।
স্কুল-কলেজে আউটরিচ
নতুন প্রজন্মের পাঠক তৈরি করতে স্কুল লাইব্রেরিতে সেবার বই পৌঁছে দেওয়া এবং বিশেষ ছাড়ে বিক্রির ব্যবস্থা করা দরকার। কিশোর-কিশোরীদের জন্য “সেবা বুক ক্লাব” চালু করা যায়।
পাঠক কমিউনিটিকে সরাসরি যুক্ত করা
কোন বই রিপ্রিন্ট হবে, কোন সিরিজ চলবে - এই সিদ্ধান্তগুলোতে পাঠকদের ভোট দেওয়ার সুযোগ দিলে প্রকাশনীর প্রতি তাদের মধ্যে দায়িত্ববোধ সৃষ্টি হবে এবং সেই বই কিনতে আরও আগ্রহী হবে। ফেসবুক গ্রুপেই এটা করা যায়। এছাড়াও পাঠক অ্যাম্বাসেডর প্রোগ্রামের মাধ্যমে যারা নিয়মিত সেবার বই কেনে তাদের বিশেষ সুবিধা দেওয়া, যেমনঃ আগেভাগে বই পাওয়া, লেখকদের সাথে সরাসরি কথা বলার সুযোগ ইত্যাদি। এতে লয়্যাল পাঠক বেস আরও শক্তিশালী হবে।
বইমেলায় অভিজ্ঞতা
বইমেলায় সেবার স্টলকে শুধু বই বিক্রির জায়গা না বানিয়ে একটি "থিম জোন" বানানো যেতে পারে যেখানে পুরোনো দিনের আদলে সাজানো পরিবেশে পাঠকরা আড্ডা দিতে পারবেন।
পডকাস্ট সিরিজ
মাসুদ রানা বা তিন গোয়েন্দার পুরোনো অ্যাডভেঞ্চারগুলো নিয়ে ইউটিউব বা ফেসবুক-এ "রহস্য রোমাঞ্চ পডকাস্ট" চালু করা যেতে পারে। শুনতে শুনতে নতুন প্রজন্মের মধ্যে বই পড়ার আগ্রহ তৈরি হবে।
এই মুহূর্তে এগুলোই মনে আছে। আপনাদের কি মনে হয়? - আমরা কি পুরনো সেবা ফিরে পাবো? এই পদ্ধতিগুলো ছাড়াও আর কি কি প্রয়োগ করা যায়?

